সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

enclaves-settlement.jpg

ছিটমহল সমস্যা কেউ ভারতে যাচ্ছেন কেউ বা বাংলাদেশে

হরিচরণ বলেন, যাওয়ার কাগজপত্র সব কিছু প্রস্তুত হয়ে গেলেও এখনো কোন জমিজমা বিক্রি করিনি। আমাদের দুই ভাইয়ের সম্পত্তি আছে ৪১ শতাংশ। শুনেছি ১ আগস্টের পর থেকে বিক্রি করা যাবে।

আতাউর রহমান। কুড়িগ্রাম দাশিয়ারছড়া ছিটমহলের অধিবাসি। পেশায় একজন শল্য চিকিৎসক। তবে ছিটের মাঝে তিনি কোন চিকিৎসা করেন না। তার কর্মস্থল ভারতের দিল্লিতে। বছরের আট মাস সেখানে কাজ করেন। সে টাকায় বাকি চার মাস বাংলাদেশে খরচ করেন। প্রতিবার ভারত যেতে আসতে তাকে দালাল বাবদ আট হাজার টাকা গুণতে হয়। ১ আগস্ট বাংলাদেশ ভারতের ছিটমহল বিনিময় হলে তাকে আর সেই টাকা গুণতে হবে না। সে চলে যাবে তার কর্মস্থলে। রুটি রুজির ঠিকানায়।

দীর্ঘ ৬৮ বছর পর তার দেশ তাকে স্বীকৃতি দিয়েছে। শুধু আতাউরই নয়। আতাউরের মত আরো ২৮৪ জন এ ছিট থেকে ফিরে যাবে নিজের দেশ ভারতে। দাশিয়ারছড়া ছিটমহল বিনিময় সমন্বয় কমিটির সভাপতি আলতাফ হোসেন জানান, এ ছিটের বাসিন্দা ৭ হাজার ঊনসত্তর জন। ভারত যাওয়ার জন্য এখান থেকে আবেদন করেছে ৩১৭ জন। পরে ৩৩ জন সিদ্ধান্ত পরিবর্তন করে জন্মভূমিতেই থেকে যাওয়ার আবেদন করেন। কাগজ কলমের হিসাব মতে এ ছিট থেকে ২৮৪ জন বাসিন্দা ভারত যাচ্ছে। তাদের বিশ্বাস, সেখানে তারা বাংলাদেশের চেয়ে ভালো কাজ পাবে। যারা থাকছে তারা জন্মভূমির টানেই থাকছে। কেউ যেতে চাইলে তাদের বাধা দেয়া হচ্ছে না। আবার কাউকে যাওয়ার জন্যও উদ্ধুদ্ধ করা হচ্ছে না। যার খুশি সে যাচ্ছে। যার ভালো লাগছে সে থাকছে।

দাশিয়ারছড়া ছিটমহলের সাধারণ সম্পাদক মোজাফ্ফর হোসেন বলেন, আমাদের দৃঢ় বিশ্বাস দীর্ঘ ৬৮ বছর পর সরকার আমাদের মৌলিক অধিকার ফিরিয়ে দিবে। দাশিয়াছড়ার উন্নয়নের জন্য আমাদের পক্ষ থেকে সরকারকে ৮৫ কোটি টাকার একটা প্যাকেজ উপস্থাপন  করেছি। এর মধ্যে স্কুল, কলেজ, মাদ্রাসা, স্বাস্থ্য কমপ্লেক্স পুলিশ ফাঁড়ি, রাস্তাঘাট, ব্রিজ কালভার্ট নির্মাণ, ইউনিয়ন পরিষদ ঘোষণা ও বিদ্যুৎসংযোগের জন্য জোরালো দাবি করা হয়েছে।

ছিটমহলের অধিবাসি মাওলানা মোফাজ্জল হোসেন বলেন, এখানে জন্মেছি। এখানকার আলো বাতাসে বড় হয়েছি। চলা ফেরায়, খাওয়া দাওয়ায় বাংলাদেশের সঙ্গে মিশে গেছি। আর এ বাংলা ও বাংলা সবইতো ঘুরে ফিরে এক। হতে পারে সেখানে গেলে অনেক সুবিধা পাওয়া যাবে। তবু আমরা সেখানে ভিনদেশী হিসেবেই আখ্যায়িত হব। প্রয়োজন নেই সুবিধার। নিজের জন্মভূমি। ডাল ভাত হলেও ভালো। কথায় আছে জায়গার ঠাকুর ভিনদেশী কুকুর।

মোফাজ্জল হোসেনের মত একই অভিব্যক্তি হরে কৃঞ্চ মহন্তের। জগদ্দল পাথর চাপা ক্ষোভ আর আক্ষেপ নিয়ে বলেন, যাওয়ার ইচ্ছা ছিল। কিন্তু নিশ্চয়তা পাচ্ছি না। আমার অসুস্থ স্ত্রীকে নিয়ে কাটা তারের কাছে ২৪ ঘন্টা ছিলাম। রাতে বিছানা করে সেখানেই শুয়ে পড়েছিলাম। অনেক করে বুঝিয়েছি আমরা ছিটের অধিবাসি। তবু বিএসএফ ঢুকতে দেয়নি। সেদিন যদি যেতে পারতাম আমার স্ত্রী হয়ত ভালো চিকিৎসা হয়ে যেত। সেদিনের ঘটনা মনে পড়লে আর যেতে ইচ্ছে হয় না।

ছিটমহলের অধিবাসি হরিচরণ মহন্ত বলেন, নিজের দেশে ফিরে যাচ্ছি ভেবে যেমন আনন্দ লাগছে তেমনি খারাপও লাগছে। ইচ্ছে ছিল বাংলাদেশে থাকার। কিন্তু বাপ দাদার ভিটে মাটিওবা কেমনে ছাড়ি। যদি আমার সামার্থ্য থাকত তাহলে পাসপোর্ট ভিসা করে মাঝে মধ্যে চাচা, জেঠাকে দেখে আসতাম। আমাদের দুই ভাইয়ের পরিবারের সদস্য ১৪ জন। চাইলে আমি ১৪ জনের পাসপোর্ট ভিসা করতে পারি না। তাই চলে যাচ্ছি। কপালে যা হয় তাই হবে। শুনেছি ভারত সরকার নাকি আমাদের ভালো সুযোগ সুবিধ দিবে। জানি না কি পাব আমরা। খুব মায়া হচ্ছে দাশিয়ারছড়ার জন্য। জানি না আর আসার সৌভাগ্য হবে কি না! বলতে বলতে চোখ বাষ্প হয়ে উঠে হরি চরণের।

হরিচরণ বলেন, যাওয়ার কাগজপত্র সব কিছু প্রস্তুত হয়ে গেলেও এখনো কোন জমিজমা বিক্রি করিনি। আমাদের দুই ভাইয়ের সম্পত্তি আছে ৪১ শতাংশ। শুনেছি ১ আগস্টের পর থেকে বিক্রি করা যাবে। কুড়িগ্রাম জেলা প্রশাসকের এক বার্তা থেকে জানা যায়, ২২ জুন থেকে ৩১ জুলাইয়ের মধ্যে জমি বিক্রি করা যাবে না। এ সময়ের পর ১ আগস্ট থেকে ৩০ নভেম্বর ২০১৫ পর্যন্ত স্ব স্ব স্থানীয় ডিসি অথবা ডিএমপি এর অনুমতিক্রমে জমি বিক্রি করা যাবে।

অখন্ড ভারত বিভক্ত করে ভারত এবং পাকিস্তান নামক দুটি স্বাধীন রাষ্ট্র প্রতিষ্ঠার লগ্নে ১৯৪৭ খ্রিস্টাব্দে রেডকিফের মানচিত্র বিভাজন থেকেই উদ্ভব ছিটমহলের। এক দেশের ভূখন্ডে থেকে যায় অন্য দেশের অংশ। এতে এক অসহনীয় মানবিক সমস্যার উদ্ভব হয় । ১৬২ টি ছিটমহল আছে দুই প্রতিবেশী দেশে। এর মধ্যে ভারতের ১১১টি ছিটমহল আছে বাংলাদেশে। আর বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল ভারতে। এসব ছিটমহলে বসবাসকারী জনসংখ্যা সংখ্যা ৫১ হাজার। সাম্প্রতিক (২০১১) জনগণনা অনুযায়ী ভারতের ছিটমহলে বসবাসরত লোকসংখ্যা ৩৭ হাজার এবং বাংলাদেশের ছিটমহলের লোকসংখ্যা ১৪ হাজার।

২৪২৬৮ একর ভূমি নিয়ে দুই দেশের ছিটমহল। তার মধ্যে ভারতের ১৭ হাজার ১৫৮ একর। বাংলাদেশের ছিটমহলের জমির পরিমাণ ৭ হাজার ১১০ একর। ভারতীয় ছিটমহলগুলোর অধিকাংশই রয়েছে বাংলাদেশের উত্তর-পশ্চিমাঞ্চলে। এ সবের মধ্যে লালমনিরহাটে ৫৯, পঞ্চগড়ে ৩৬, কুড়িগ্রামে ১২ ও নীলফামারিতে চারটি ভারতীয় ছিটমহল রয়েছে। অপরদিকে বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহলের অবস্থান ভারতের পশ্চিমবঙ্গ রাজ্যে। এর মধ্যে ৪৭টি কুচবিহার ও চারটি জলপাইগুড়ি জেলায় অবস্থিত।

ছিটমহলের উৎস: 
কুচবিহার রাজ্যের কোচ রাজার জমিদারির কিছু অংশ রাজ্যের বাইরের বিভিন্ন থানা পঞ্চগড়, ডিমলা, দেবীগঞ্জ, পাটগ্রাম, হাতিবান্ধা, লালমনিরহাট, ফুলবাড়ী ও ভুরুঙ্গামারিতে অবস্থিত ছিল। ভারত ভাগের পর ওই আট থানা পূর্ব পাকিস্তানে অন্তর্ভুক্ত হয়। আর কুচবিহার একীভূত হয় পশ্চিমবঙ্গের সঙ্গে। ফলে ভারতের কিছু ভূখন্ড আসে বাংলাদেশের কাছে। আর বাংলাদেশের কিছু ভূখন্ড যায় ভারতে। এই ভূমিগুলোই হচ্ছে ছিটমহল।

সীমানা নির্ধারণের সমস্যা:
১৯৪৭ সালে বাংলা ও পাঞ্জাবের সীমারেখা টানার পরিকল্পনা করেন লর্ড মাউন্টবেটন। তাঁর পরিকল্পনা অনুযায়ী ব্রিটিশ আইনজীবী সিরিল রেডকিফকে প্রধান করে সে বছরই গঠন করা হয় সীমানা নির্ধারণের কমিশন। ১৯৪৭ সালের ৮ জুলাই লন্ডন থেকে ভারতে আসেন রেডকিফ। মাত্র ছয় সপ্তাহের মাথায় ১৩ আগস্ট তিনি সীমানা নির্ধারণের চূড়ান্ত প্রতিবেদন দেন। এর তিন দিন পর ১৬ আগস্ট জনসমুক্ষে প্রকাশ করা হয় সীমানার মানচিত্র।

কোনো রকম সুবিবেচনা ছাড়াই হুট করে এ ধরনের একটি সিদ্ধান্ত নেওয়ায় সীমানা নির্ধারণের বিষয়টি যথাযথভাবে হয়নি। অভিযোগ রয়েছে, কমিশন সদস্যদের নিষ্ক্রিয়তা আর জমিদার, নবাব, স্থানীয় রাজনীতিবিদ ও চা বাগানের মালিকেরা নিজেদের স্বার্থে দেশভাগের সীমারেখা নির্ধারণে প্রভাব ফেলেছে। আর উত্তরাধিকার সূত্রেই উপমহাদেশের বিভক্তির পর এই সমস্যা বয়ে বেড়াচ্ছে দুই দেশ।

১৯৫৮ সালের নেহেরু-নুন চক্তি অনুযায়ী বেরুবাড়ীর উত্তর দিকের অর্ধেক অংশ ভারত এবং দক্ষিন দিকের অর্ধেক অংশ ও এর সংলগ্ন এলাকা পাবে বাংলাদেশ। চুক্তি অনুযায়ী বেরুবাড়ীর সীমানা নির্ধারণের উদ্যোগ নেওয় তা মুখ থুবড়ে পড়ে। ফলে বেরুবাড়ীর দক্ষিন দিকের অর্ধেক অংশ ও এর ছিটমহলের সুরাহা হয়নি। এরপর ১৯৭৪ এর ইন্দিরা-মুজিব চুক্তির পর দুই দেশ ছিটমহলের আলাদা আলাদাভাবে তালিকা তৈরির কাজ শুরু করে। কিন্তু দুই পরে তালিকায় দেখা দেয় গরমিল। পরে ১৯৯৭ সালের ৯ এপ্রিল চূড়ান্ত হয় বাংলাদেশের অভ্যন্তরে ভারতের ১১১টি ও ভারতের অভ্যন্তরে বাংলাদেশের ৫১টি ছিটমহল রয়েছে।

এখানে বলে রাখা ভালো, ১৯৫৮ সালে সই হওয়া নেহেরু-নুন চুক্তিতে ছিটমহল বিনিময়ের উল্লেখ থাকলেও এ ব্যাপারে ভারতের তৎকালীন রাষ্ট্রপতি সে দেশের সংবিধানের ১৪৩ ধারা সম্পর্কে সুপ্রিম কোর্টের মতামত চান। তখন আদালতের পক্ষ থেকে বলা হয়, সংবিধানের সংশোধনীর মাধ্যমে বিষয়টির নিষ্পত্তি করতে হবে। পরে ভারতের পক্ষ থেকে বিভিন্ন সময়ে সংবিধান সংশোধনী আর জনগণনার অজুহাতে বিলম্বিত হয়েছে ছিটমহল বিনিময়।

এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

enclaves, India, Bangladesh, nationality, citizen, migration, homeland, Treaty