সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

বাক্সবন্দী

বানানরীতি

পুলিশ বানান ও গলদ পাঠ


এ লেখার উদ্দেশ্য এই নয় যে, জনসাধারণ মনে করুক পুলিশ ফেরেশতা অথবা শয়তান। বরং জনসাধারণ মনে করুক পুলিশ তাদের অংশ এবং মানুষ। এরাও ভুল করে, এরাও অপরাধে জড়ায়। এরা যাতে জনগণের সঙ্গে সঙ্গত ও কাম্য আচরণ করতে বাধ্য হয় সে - ব্যাপারে কার্যকরী পদক্ষেপ এবং যথাযথ আইন প্রণয়ন করাও জরুরি।


সিনিয়র সহকারী পুলিস সুপার ১৭ জুন ২০১৫, ১০:৫৯


‘পুলিশ’ আধুনিক রাষ্ট্রযন্ত্রের একটি অপরিহার্য ও স্থায়ী অঙ্গ হিসেবে অবস্থান করে নিয়েছে। গত এক-দেড় শতাব্দীতে বিশ্বের অধিকাংশ দেশ তাদের ‘পুলিশিং’ ব্যবস্থা সুশৃংখল ও জনগণের বন্ধুরূপে গড়ে তুলেছে। আজ তথ্যপ্রযুক্তির যুগে পুলিশসেবা তারা এমন জায়গায় নিয়ে গেছে যে, পুলিশ প্রতিটি নাগরিকের সঙ্গে ছায়ার মতো থেকে তার নিরাপত্তা বিধান করছে। সেজন্য এ পুলিশ যে কোনো মুহূর্তে যে কোনো পরিস্থিতিতে সম্পৃক্ত নাগরিকের অবস্থা-পরম্পরা বলে দিতে পারে এবং মুহূর্তে দেশের প্রতিটি অঞ্চলে সে তথ্য ছড়িয়ে দিতে পারে। 

অতি জনসম্পৃক্ত একটি বাহিনী হিসেবে বাংলাদেশে পুলিশকে কেন নেতিবাচকতার বৃত্ত থেকে বের করে আনা সম্ভব হচ্ছে না - সে ব্যাপারেই বস্তুনিষ্ঠ, নির্মোহ আলোচনা সময়ের দাবি। আর এসব দিকের মধ্যে ‘পুলিশ’ বানানটি কী কীভাবে নেতিবাচক এবং বানানরীতির সঙ্গে সামঞ্জস্যহীন এ নিয়ে আলোকপাত করা প্রয়োজন।

বাংলা বানানরীতির প্রচলিত ধারাকে বাদ দিয়ে অনেক ক্ষেত্রেই বাংলা বানান এমনভাবে লেখা হচ্ছে যা বিভ্রান্তিকর। আজও বাংলা বানান নিয়ে অনেক দোদুল্যমানতা রয়ে গিয়েছে যার নিরসন করা প্রয়োজন। এ ধরনের বানানের একটি উদাহরণ ‘পুলিশ’। রবিঠাকুরের কাব্যগ্রন্থ ‘খাপছাড়া’তে ‘নিধু বলে আড় চোখে’ কবিতায় ইংরেজি 'police' শব্দের বানান ‘পুলিস’ লেখা হয়েছে ... ‘পুলিস যখন করে ঘরে এসে চড়োয়া’।

কবিতাটি প্রথম অংশটি এমন :
নিধু বলে আড়চোখে, 'কুছ নেই পরোয়া।
স্ত্রী দিলে গলায় দড়ি বলে, এটা ঘরোয়া।'
দারোগাকে হেসে কয়, 'খবরটা দিতে হয়...
পুলিস যখন করে ঘরে এসে চড়োয়া।'
বলে, 'চরণের রেণু নাহি চাহিতেই পেনু।’...
এই বলে নিধিরাম করে পায়ে-ধরোয়া।

বাংলা ভাষার প্রতিবেশী ভাষা হিন্দিতে 'police' শব্দের বানানও রবিঠাকুরের লেখা বানানের অনুরূপ লেখা হয়েছে। যেমন, ভারতীয় পুলিশের ওপর লিখিত বইয়ে এবং মধ্যপ্রদেশ 'police'-এর প্রতীকে ‘পুলিশ’ নয়, ‘পুলিস’ বানান লেখা হয়েছে। এ ব্যাপারে এ-ও বলা যায় যে, ভারতীয় 'police' সেবার কোথাও 'police' শব্দটি ‘পুলিশ’ হিসেবে লেখা হয়নি। বেশিরভাগ জায়গাতে বানানটি লেখা হয়েছে ‘পুলিস’। যেমন উত্তর প্রদেশ পুলিস, মধ্যপ্রদেশ পুলিস, দিল্লি পুলিস ইত্যাদি। তবে কিছু জায়গায় ‘পোলিস’ লেখা হয়েছে যেমন মহারাষ্ট্র পোলিস। তাই বলা যায়, বাংলাতেই শুধু বানানটি ‘পুলিশ’ লেখা হচ্ছে।

বিভিন্ন ধরনের নেতিবাচক ব্যাপারের সঙ্গে বাংলায় লিখিত ‘পুলিশ’ শব্দের অনুরণন দেখা যায়। যেমন: ‘মড়া খায় ইলিশে, ঘুষ খায় পুলিশে’ বা ‘মাছের রাজা ইলিশ, জামাইয়ের রাজা পুলিশ।’ উপরন্তু বাংলা ‘পুলিশ’ শব্দকে ইংরেজি ‘Foolish’ শব্দের সঙ্গে মিলিয়েও চালু আছে নানা মুখরোচক কথাবার্তা। অথচ শব্দটির বানান ‘পুলিস’ লিখলে তা অনেক সুন্দর এবং প্রাঞ্জল হতো।

প্রাসঙ্গিকভাবে যদি আমরা বাংলা একাডেমির প্রমিত বানান খেয়াল করি তাহলে দেখব শ, ষ, স-এর ব্যবহারের ক্ষেত্রে নিন্মোক্ত নিয়মের কথা বলা আছে: ‘তৎসম শব্দে শ, ষ, স-য়ে নিয়ম মানতে হবে? এ-ছাড়া অন্য কোনো ক্ষেত্রে সংস্কৃতের ষত্ব-বিধি প্রযোজ্য হবে না। বিদেশী মূল শব্দে শ, স-য়ের যে প্রতিষঙ্গী বর্ণ বা ধ্বনি রয়েছে বাংলা বানানে তাই ব্যবহার করতে হবে। যেমন: সাল (বৎসর), সন, হিসাব, শহর, শরবত, শামিয়ানা, শখ, শৌখিন, মসলা, জিনিস, আপস, সাদা, পোশাক, বেহেশ্ত, নাশতা, কিশমিশ, শরম, শয়তান, শার্ট, স্মার্ট। তবে, পুলিশ শব্দটি ব্যতিক্রমরূপে শ দিয়ে লেখা হবে।’

আর এ জায়গাটিই হচ্ছে আপত্তির। বাংলা ব্যাকরণের নিয়ম অনুযায়ী - সব ইংরেজি শব্দ যেখানে ইংরেজি s, sh, ce বা cy আছে সেগুলো বাংলায় লিখলে শুধু বাংলা বর্ণ ‘স’ দিয়ে লিখতে হবে। যেমন : স্টার (Star), স্টুডিও (Studio), স্টোর (Store), পলিসি (Policy) ইত্যাদি। ঠিক একইভাবে পুলিশ (Police) না লিখে পুলিস। যেখানে বাংলার মতো সংস্কৃত ভাষা থেকে উদ্ভূত অন্যান্য প্রতিবেশী ভাষাতে সংস্কৃত ব্যাকরণের বিদেশী শব্দ বানানরীতির আদলে ‘পুলিস’ লেখা হচ্ছে সেখানে বাংলায় কেন এভাবে লেখা হবে তার কোনো ব্যাখ্যা নেই। বরঞ্চ ভুল বানানের সঙ্গে আবর্তিত হচ্ছে বহুল প্রচলিত এবং প্রতিনিয়ত ব্যবহার হওয়া এ শব্দটি। ‘পুলিশ’... এই বানান প্রতিনিয়তই চোখে পড়ে থানা, প্রিজন ভ্যান, টহল গাড়ি ইত্যাদির মতো পুলিশের বিভিন্ন জনসম্পৃক্ত স্থাপনা ও যানবাহনের গায়ে। এগুলো বারবার জনসাধারণের চোখে পড়ে।

তাছাড়া শব্দটি ইংরেজি 'Police' শব্দ থেকেই যেহেতু এসেছে, এ ক্ষেত্রে ব্যতিক্রমী বানানরীতি চালু করে ভাষার স্বাভাবিকতা ঠিক রাখা হল কিনা সে প্রশ্ন করাই যায়। ঢাকার বহুল প্রচলিত ইংরেজি ভুল বানান Dacca আমরা কয়েক শতক ব্যবহার ও লালন করেছি। অবশ্য পরে, ১৯৮২ সালের পর, বাংলা উচ্চারণের সঙ্গে মিল রেখে ঢাকার ইংরেজি বানান আমরা Dhaka করেছি।

এ ছাড়া পুলিশের কোনো সদস্য কোনো অপকর্ম করলে সেই ক্ষেত্রে পুরো পুলিশকে দায়ী করে সংবাদপত্রে লেখার প্রবণতাও লক্ষ্য করা যায়। যেমন ‘শিক্ষককে লাঞ্ছিত করল পুলিশ’। ‘তরুণীর শ্লীলতাহানি করল পুলিশ’। মানে এখানে সমস্ত পুলিশ বাহিনীকেই প্রকারান্তরে যুক্ত করে ফেলা হল। কিন্তু একই ধরনের আরেকটি শিরোনাম, ‘গাছে বেঁধে বউ পেটালেন সেনাসদস্য’। কিন্তু পুলিশ সদস্য বা কর্মী না লিখে এ ঘটনা পুলিশ সদস্য দ্বারা হলে বলা হতো ‘গাছে বেঁধে বউ পেটাল পুলিশ’। এ জাতীয় বৈপরিত্য কাম্য নয়।

এ লেখার উদ্দেশ্য এই নয় যে, জনসাধারণ মনে করুক পুলিশ ফেরেশতা অথবা শয়তান। বরং জনসাধারণ মনে করুক পুলিশ তাদের অংশ এবং মানুষ। এরাও ভুল করে, এরাও অপরাধে জড়ায়। এরা যাতে জনগণের সঙ্গে সঙ্গত ও কাম্য আচরণ করতে বাধ্য হয় সে - ব্যাপারে কার্যকরী পদক্ষেপ এবং যথাযথ আইন প্রণয়ন করাও জরুরি।

পরিশেষে বলা যায়, পুলিশিং আধুনিক রাষ্ট্রের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ একটি দায়িত্ব হিসেবে সর্বত্র স্বীকৃত। কোনো রাষ্ট্র হয়তো সামরিক বাহিনী ছাড়াও সামরিক চুক্তির মাধ্যমে দেশের স্বাধীনতা সার্বভৌমত্ব ভালোভাবেই রক্ষা করতে পারবে কিন্তু অভ্যন্তরীণ আইনশৃংখলা, নাগরিক নিরাপত্তা, উন্নয়ন, শিক্ষা, স্বাস্থ্য, বিচার কোনো কিছুই সম্ভব নয় একটি সুশৃংখল, জনবান্ধব পুলিশিং ব্যবস্থা ছাড়া। তাই পুলিশকে অধিকতর জনসম্পৃক্ত এবং জনবান্ধব করতে হলে এ ধরনের ভুল এবং নেতিবাচক মনোভঙ্গি প্রদানকারী বানানরীতি পরিহার করাও সময়ের দাবি।

সর্বোপরি স্বাধীনতা লাভের এত বছর পরেও সময়োপযোগী বানানরীতি না থাকা ভাষাগবেষক, ভাষাপ্রেমী প্রত্যেকের কাছে পীড়াদায়ক। তাই বাংলা একাডেমির প্রমিত বানানরীতির সঙ্গে সংশ্লিষ্টরা যদি এ ব্যাপারে উদ্যোগী হন এবং একাডেমি থেকে প্রকাশিত অভিধানগুলোতে যদি ‘পুলিস’ বানান অন্তর্ভুক্ত করেন তাহলে জাতির মননে তা গেঁথে যাবে সহসাই। তাছাড়া পত্রিকাগুলোতেও এ বানান লিখিত হলে সহজেই এ নেতিবাচকতা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া যেত।


বিশেষ দ্রষ্টব্য: এই লেখাটি ১৭ জুন ২০১৫'র দৈনিক যুগান্তরে প্রকাশিত

-
লেখক সিনিয়র সহকারী পুলিশ সুপার হিসেবে বিমানবন্দর আর্মড পুলিশ, হযরত শাহজালাল আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরে কর্মরত 


এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

police, Bangladesh, Positive, spelling, mistakes, constructive, branding


ঢাকার নামকরণের ইতিহাস এবং প্রাসঙ্গিক ঐতিহাসিক ঘটনাবলী

বাংলাদেশের রাজধানী ঢাকা মোঘল-পূর্ব যুগে কিছু গুরুত্বধারন করলেও শহরটি ইতিহাসে প্রসিদ্ধি লাভ করে মোঘল যুগে। ঢাকা নামের উৎপত্তি সম্পর্কে স্পষ্ট করে তেমন কিছু জানা যায় না। এ সম্পর্কে প্রচলিত মতগুলোর মধ্যে কয়েকটি নিম্নরূপ: ক) একসময় এ অঞ্চলে প্রচুর ঢাক গাছ (বুটি ফুডোসা) ছিল; খ) রাজধানী উদ্বোধনের দিনে ইসলাম খানের নির্দেশে এখানে ঢাক অর্থাৎ ড্রাম বাজানো হয়েছিল; গ) ‘ঢাকাভাষা’ নামে একটি প্রাকৃত ভাষা এখানে প্রচলিত ছিল; ঘ) রাজতরঙ্গিণী-তে ঢাক্কা শব্দটি ‘পর্যবেক্ষণ কেন্দ্র’ হিসেবে উল্লেখিত হয়েছে অথবা এলাহাবাদ শিলালিপিতে উল্লেখিত সমুদ্রগুপ্তের পূর্বাঞ্চলীয় ...

১৮৬৯ এর আগে শরীয়তপুর জেলা বৃহত্তর বিক্রমপুর এর অংশ ছিল

জেলা হিসেবে ১৯৮৪ সালে আত্মপ্রকাশ করলেও এ অঞ্চলটি সৃষ্টির প্রথম হতেই বাংলাদেশের অন্যান্য অঞ্চলের ন্যায় সকল ব্যাপারেই বিকশিত হতে থাকে। ইতিহাসের আদিকাল হতেই বিভিন্ন সামন্ত প্রভু ও রাজা দ্বারা এ অঞ্চল শাসিত হয়ে এসেছিল। আদিকালে শরীয়তপুরের এ অঞ্চল ‘বংগ’ (Vanga) রাজ্যের অধীনে ছিল। ‘বংগ’ পদ্মা নদীর দক্ষিণে বদ্বীপ অঞ্চলে বিস্তৃত তৎকালীন রাজ্যের নাম। এটি তৎকালীন ভাগীরথী এবং পুরাতন ব্রক্ষ্মপুত্র নদীর দক্ষিণাঞ্চল নিয়ে বিস্তৃত অঞ্চল। দ্বিতীয় চন্দ্রগুপ্তের (৩৮০ খৃঃ - ৪১২ খৃঃ) রাজত্বকালে প্রখ্যাত কবি কালিদাসের ‘রঘুবানসা’ গ্রন্থে তিনি এ অঞ্চলকে গঙ্গানদীর প্রবাহে...