সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

Public-Urination-Dhaka.jpg

যত্রতত্র মূত্রত্যাগ স্বাস্থ্যকর ও পরিচ্ছন্ন নগরী গড়তে বাস্তবসম্মত ও কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করুন

সবচেয়ে বড় কথা হলো একান্ত প্রয়োজনের সময়, যখন আর বিকল্প কোন উপায় থাকে না তখন মানুষ আইন অমান্য করতেও দ্বিধা করে না। আর আরবি-ফারসিতো একটি ভাষা মাত্র। আর তাই আরবি ভাষাকে বিশেষ কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা এ সমস্যার কোন যৌক্তিক সমাধান হতে পারে না।

সম্প্রতি যত্রতত্র মূত্রত্যাগ রোধে ধর্ম মন্ত্রণালয় কর্তৃক নির্মিত একটি ভিডিও নিয়ে ফেসবুকসহ সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমগুলোতে ব্যাপক আলোচনা-সমালোচনার ঝড় উঠেছে। আরবি ভাষা ব্যবহারের মাধ্যমে বিশেষ কৌশলে যত্রতত্র মূত্রত্যাগ করা থেকে মানুষকে বিরত রাখার  উদ্দেশ্যে এই বিজ্ঞাপন ভিডিওটি নির্মান করা হয়। 

ভিডিওটিতে দেখা যায়, কিছু লোক প্রকাশ্যে-জনসম্মুখে যেখানে সেখানে তাদের প্রয়োজনীয় কর্ম (মূত্রত্যাগ) সম্পাদন করছেন। এমন কি খাঁটি বাংলা ভাষায় লেখা স্পষ্ট নিষেধাজ্ঞা থাকার পরও তারা এহেন কর্ম থেকে বিরত হচ্ছেন না। ফলে একদিকে নগরীর পরিবেশ যেমন অস্বাস্থ্যকর, নোংরা ও দূষিত হচ্ছে, অন্যদিকে তা বিভিন্ন রকম রোগ জীবানু ছড়াচ্ছে। পরিবেশ দূষনকারী এই খারাপ কাজ থেকে জনগণকে বিরত রাখতে ধর্ম মন্ত্রণালয় একটি বিশেষ কৌশলের আশ্রয় নিয়েছে। আর তা হলো বাংলা ভাষায় লিখা নিষেধাজ্ঞার স্থলে আরবি ভাষায় লিখে  নিষেধাজ্ঞা আরোপ করা। 

ধর্ম মন্ত্রণালয় নির্মিত বিজ্ঞাপন চিত্রটিতে দেখা যায়, আরবীতে লেখা নিষেধাজ্ঞা 'এখানে মূত্রত্যাগ করা নিষেধ' দেয়াল লিখনটি চোখে পড়ার পর আর কেউ সেখানে মূত্রত্যাগ করছেন না। সবাই যত্রতত্র মূত্রত্যাগ করার মত খারাপ কাজ থেকে নিজেদের বিরত রাখছেন। 

আমাদের মহাগ্রন্থ আল কুরআন এর ভাষা আরবি। আর সেই কারনেই আরবি ভাষার প্রতি  মুসলমানদের বিশেষ শ্রদ্ধাবোধ রয়েছে। জ্ঞাতসারে কখনো আমরা এ ভাষার অপমান বা অবজ্ঞা করি না। আবার অন্য কেউ  অবজ্ঞা বা অবমাননা করলে সেটি ও সহ্য করতে পারি না। তাই আরবি ভাষার প্রতি আমাদের বিশেষ দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে তারা এই বিজ্ঞাপন চিত্রটি নির্মান করেন। তাদের বিশ্বাস এতে করে মানুষ যেখানে সেখানে মূত্রত্যাগ করা থেকে বিরত থাকবেন।  

ধর্মমন্ত্রীর নিজের ভাষ্যমতে, 'আরবিতে লেখা দেখলে মানুষ কোরআন আবমাননার ভয়ে আর এখানে মূত্রত্যাগ করতে বসবে না'। বিজ্ঞাপন ভিডিওটিতে ঠিক তাই দেখানো হয়েছে। দেয়ালে কি লিখা আছে সেটি না বুঝলেও শুধু  আরবি লেখা দেখেই সবাই ভয় পেয়ে উঠে যাচ্ছেন। কেউ কেউ আমার শ্রদ্ধাবশত সেই আরবি লেখাকে সালামও করছেন। 

নগরীর পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ও স্বাস্থ্যকর পরিবেশ বজায় রাখার স্বার্থে যত্রতত্র মূত্রত্যাগ করাকে নিরুৎসাহিত করা এবং এ ধরনের কাজ থেকে মানুষকে বিরত রাখার জন্যে ধর্ম মন্ত্রণালয়ের এমন উদ্যোগকে স্বাগত জানাই। তবে এক্ষেত্রে আরবি ভাষার ব্যবহারকে বিশেষ কৌশল হিসেবে গ্রহণ করা আমার কাছে খুব একটা যৌক্তিক ও গ্রহযোগ্য পদ্ধতি বলে মনে হচ্ছে না।

কেননা এক্ষেত্রে প্রকারান্তরে আমাদের মাতৃভাষা বাংলার প্রতি এক ধরনের অবজ্ঞা ও অবহেলার বহিঃপ্রকাশ ঘটছে। বিজ্ঞাপনচিত্রে দেখানো হয়েছে, মানুষ আরবির প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধাবোধ থেকে এমন খারাপ কাজ থেকে বিরত থাকছে। অথচ স্পষ্ট বাংলা ভাষায় লেখা নিষেধাজ্ঞার কোনরকম তোয়াক্কাই  করছে না। আরবি ভাষা আল কুরআনের ভাষা। আর তাই মুসলমানদের কাছে এর বিশেষ মর্যাদা রয়েছে, একথা সত্য। কিন্তু আরবি ভাষার অবমাননা মানেই কি কুরআন অবমাননা? বাংলা যেমন একটি ভাষা, ইংরেজি যেমন একটি ভাষা, আরবিও তেমনই একটি ভাষা। সব ভাষাতেই ভালো-মন্দ দুটোই লেখা যায়। যে ভাষাতেই লেখা হোক না কেন, ঠিক কি লেখা হয়েছে মানুষকে সেটি বুঝাতে পারাই আসল কথা। আর এক্ষেত্রে আমাদের মাতৃভাষা বাংলার ব্যবহারই শ্রেয় বলে মনে হয়। কেননা এ দেশের শতকরা ৮৬ ভাগ লোক মুসলমান হলেও অধিকাংশই আরবির অর্থ বুঝেন না।

আবার পথে-ঘাটে, রাস্তার পাশে যত্রতত্র যারা মূত্রত্যাগ করে থাকেন তারা সবাই যে মুসলমান তাও ঠিক নয়। এ দেশে নানান ধর্ম–বর্ণের মানুষের বসবাস। সকলের নিশ্চয়ই আরবির প্রতি বিশেষ শ্রদ্ধাবোধ বা ভয় কাজ করে না। আর তাই তাদের ক্ষেত্রে এ কৌশল কতটা কার্যকরি হবে তা বোধগম্য নয়। তাছাড়া আল কুরআনের ভাষা হিসেবে আরবির প্রতি যেহেতু  মুসলমানদের বিশেষ শ্রদ্ধাবোধ রয়েছে, তাই আরবিতে লেখা নিষেধাজ্ঞা দেখার পরও কেউ যদি সেটি অমান্য করে সেখানে মূত্রত্যাগ করে তবে মুসলমানদের অনুভূতিতে আঘাত লাগাটা খুবই স্বাভাবিক। ফলে এমন ঘটনাকে কেন্দ্র করে নতুন কোন সমস্যার সৃষ্টি হতে পারে। কাজেই ধর্ম মন্ত্রণালয়ের এমন কৌশল সমর্থনযোগ্য হতে পারে না।

সবচেয়ে বড় কথা হলো একান্ত প্রয়োজনের সময়, যখন আর বিকল্প কোন উপায় থাকে না তখন মানুষ আইন অমান্য করতেও দ্বিধা করে না। আর আরবি-ফারসিতো একটি ভাষা মাত্র। আর তাই আরবি ভাষাকে বিশেষ কৌশল হিসেবে ব্যবহার করা এ সমস্যার কোন যৌক্তিক সমাধান হতে পারে না। কাজেই আমাদের উচিত সর্বাগ্রে সমস্যার সঠিক কারণ চিহ্নিত করা এবং সে অনুযায়ী কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণ করা। আর সেটি করতে পারলেই যত্রতত্র মূত্রত্যাগ করা থেকে মানুষকে বিরত রাখা সম্ভব হবে।     

যত্রতত্র মূত্রত্যাগ করার একটি প্রধান কারণ হলো অপর্যাপ্ত পাবলিক টয়লেট। ঘনবসতিপূর্ণ এই শহরে প্রায় দেড়কোটি লোকের বসবাস। আর সে তুলনায় পাবলিক টয়লেটের সংখ্যা খুবই সামান্য। যেগুলো আছে তাও আবার অপরিস্কার, ময়লা-আবর্জনায় পূর্ণ, অস্বাস্থ্যকর ও ব্যবহারের অনুপযোগী। আর তাই জরুরি প্রয়োজনে মানুষের বিকল্প কোন উপায় না থাকায় বাধ্য হয়েই রাস্তার পাশে, ফুটপাতে মূত্রত্যাগ করছেন। যদি পর্যাপ্ত পাবলিক টয়লেটের ব্যবস্থা থাকতো এবং স্বাচ্ছন্দে মানুষ সেগুলো ব্যবহার করার সুযোগ পেত তাহলে এ ধরনের পরিবেশ দূষণ অনেকাংশে হ্রাস পেতো।

কাজেই এ সমস্যার কার্যকরি সমাধানকল্পে, সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত পর্যাপ্ত পাবলিক টয়লেট নির্মান এবং সেগুলো পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও জনসাধারনের ব্যবহারের জন্যে উন্মুক্ত রাখা। মসজিদের টয়লেটগুলো পরিস্কার-পরিচ্ছন্ন রাখা এবং প্রয়োজনে সকলের ব্যবহারের সুযোগ করে দেয়া। সরকারী-বেসরকারি ভবন, শিক্ষা প্রতিষ্ঠান, হাসপাতাল, শপিং মল, বানিজ্যিক ভবন এবং খাবার হোটেলগুলোতে পর্যাপ্ত টয়লেট নির্মান করা এবং সকলের ব্যবহারের ব্যবস্থা রাখা। 

আর যত্রতত্র মূত্রত্যাগ করার সবচেয়ে বড় কারণ হলো জনসচেতনতার অভাব। মানুষ আস্বাস্থ্যকর পরিবেশ এবং পরিবেশ দূষনের কূফল সম্পর্কে এখনো সচেতন নয়। আর সচেতনতার অভাবেই তারা যত্রতত্র মূত্রত্যাগ করে শহরটাকে অপরিস্কার-নোংরা করে চলেছেন এবং অহরহ পরিবেশ দূষিত করছেন। 

আমাদের রেডিও, টেলিভিশন চ্যানেল এবং পত্রিকাগুলোতে এমনকি রাস্তার মোড়ে মোড়ে, শপিং মলে এবং বড় বড় ভবনে ঝুলানো প্রায় সবগুলো বিলবোর্ড বানিজ্যিক বিজ্ঞাপন চিত্রে সয়লাব। আমরা চাইলেই এইসব গণমাধ্যম ও বিলবোর্ড ব্যবহার করে জনসচেতনতা সৃষ্টি করতে পারি। জন স্বাস্থ্য ও পরিবেশের সাথে সংশ্লিষ্ট সরকারের বিভিন্ন সংস্থা ও সিটি কর্পোরেশন কর্তৃক যত্রতত্র মূত্রত্যাগ করার অপকারিতা তুলে ধরে জনসাধারণকে সচেতন করতে পারলে এ ধরনের কাজ থেকে বিরত রাখা সম্ভব হতে পারে। 

আর এই ধরনের জনসচেতনতামূলক কর্মকান্ডে আমাদের মাতৃভাষা বাংলার ব্যবহারের প্রতিই বিশেষ গুরুত্বারোপ করছি। এতে মানুষ পরিবেশ দূষনের অপকারিতা সম্পর্কে জানতে পারবে। আর কুফল সম্পর্কে সচেতন হলেই মানুষ স্বেচ্ছায় এ ধরনের খারাপ কাজ থেকে নিজেদের বিরত রাখবে।  

তবে এক্ষেত্রে জনসচেতনতা সৃষ্টিতে ধর্মীয় দৃষ্টিভঙ্গিও প্রয়োগ করা যেতে পারে। যেমন, ইসলাম ধর্মে বলা আছে, পরিষ্কার পরিচ্ছন্নতা ঈমানের অর্ধেক। ধর্মীয় দৃষ্টিকোণ থেকে পরিবেশ দূষণ একটি নিন্দনীয় কাজ। পরিস্কার-পরিচ্ছন্নতা, জনস্বাস্থ্য ও পরিবেশ সম্পর্কিত এমন অসংখ্য উক্তি রয়েছে যেগুলো মানুষকে সচেতন করে তুলতে পারে। এগুলো বাংলায় লিখে প্রচার করা যেতে পারে।

পরিশেষে, সকলের বাসযোগ্য একটি স্বাস্থ্যকর, পরিষ্কার-পরিচ্ছন্ন ও দৃষ্টিনন্দন নগরী গড়ে তোলার লক্ষ্যে বাস্তবসম্মত ও কার্যকরী ব্যবস্থা গ্রহণের জন্যে সরকারের সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষ এবং নবনির্বাচিত মেয়রদের প্রতি জোর দাবি জানাচ্ছি।


এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

public, urination, cleanliness, healthy, toilet, population, plan, facility