সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

dhaka-street-view.jpg

বিচিত্র অভিজ্ঞতা ঢাকার ফুটপাতে একদিন

কিন্তু কার কী! বরং পথচারী-যাত্রীদের অধিকাংশই দেখলাম, দৃশ্যটি দর্শকের মত দারুন ভাবে উপভোগ করছে! বেগম সাহেবাকে দেখলাম, কোন রকমে ওই ছেমরীর হাতে কিছু গুঁজে দিয়ে বেঁচে যাবার আপ্রাণ চেষ্টা করছে!

ঢাকার জনাকীর্ণ ফুটপাত ধরে হাটছি। তাড়া আছে বলে একটু দ্রুতই চলার চেষ্টা। কিন্তু তার কী উপায় আছে! ফুটপাতের নীচ দিয়ে চলার চেষ্ট বৃথা, কারণ রাস্তায় গাড়ীর জ্যাম এতটাই প্রকট যে, একবারে ফুটপাতে উঠে পড়ার উপক্রম! আরে উপক্রম বলছি কী! মাঝে মাঝেই তো বলা নেই কওয়া নেই পারে তো বিনা মেঘে বজ্রপাতের মত জানের উপর দিয়েই মটর সাইকেল চালিয়ে দেয় আর কী! তাও কী দুই একটা নাকি! একের পর এক লাইন ধরে স্রোতের মত আসতেই থাকে! পড়ি মরি করে সরে যাবার সময় কখনও ফুটপাতে সাজিয়ে বসা পসরার মেলার উপর, না হলে হুরমুর করে নারীর শরীরে গিয়ে ধাক্কা খাওয়ার বেজায় ঝুঁকি! 

হায় আল্লাহ্! যাই কোথায়, কী যে করি! তবুও চলতে হয়, চলতে হবে। নিজের কথাই বা কী বলব আর মেয়েদের কথাই বা কী বলব! যে দিন পড়ে গেছে, নারী-পুরুষ সবাইকেই এখন রোজগারের চেষ্ট করতে হয়, নাহলে মান-সম্মান নিয়ে বাঁচাইতো দায়! আবার চলতি পথে ভুল-ভ্রান্তি হলে কিন্তু খবর আছে! মেয়েদের তো আবার শুভাকাঙ্খীর অভাব নেই। বয়সও দেখবে, না অবস্থাও বুঝবে না! এক হাত নিতে পারলেই যেন ওরা কৃতার্থ হয়ে যায় ! নিজেদের চেহারাটা একবার আয়নায় দেখবার গরজ নেই!

সামনে চার রাস্তার সংযোগ স্থল। ট্রাফিক সিগন্যালে লাল বাতি জ্বলে অছে। গাড়ীগুলো ঠায় দাঁড়িয়ে আছে। ছেঁড়া ঝুলি নোংরা পোশাকে কোন রকমে গতরটাকে ঢেঁকে ঢুঁকে আবালবৃদ্ধবনিতার দল এ গাড়ী ছেড়ে সে গাড়ীর সাহেব-বেগমদের কাছে হাত পেতে যা পাচ্ছে তাই নিয়েই কেটে পড়ছে। কেউ কেউ আবার গাড়ীর কাঁচ লাগিয়ে দিয়ে নিজেদের নিরাপদ ভাবার চেষ্টা করছে! দু’একটা শিশু আবার ফুলের মালা বিক্রী করে ভিক্ষা বৃত্তির নিন্দিত পেশা থেকে নিজেকে রক্ষার চেষ্ট করছে। 

এরই মধ্যে আবার এক মাঝ বয়সী মহিলা কাঠের ঠেলা গাড়ীতে আর এক বৃদ্ধকে বসিয়ে ফুটপাত দিয়ে ঠেলতে ঠেলতে আমার দিকেই আসছে। ভাবছিলাম কিছু দিব। কিন্তু খেয়াল করে দেখলাম, টুপি পড়া বৃদ্ধ লোকটা সুর করে কলেমা তৈয়বাকে এমন ভাবে গান অথবা গজল বানিয়ে ফেলেছে, যার অনেক জায়গায়ই অবলীলায় ভুল উচ্চারণ করে যাচ্ছে! আর সেই সাথে সাথে মহিলাও গলা চড়িয়ে সারি ধরেছে! কে যে ওদের মগজের ভেতর এই কৌশলটা ঢুকিয়ে দিয়েছে আল্লাহ্ই ভাল জানেন! মনের ভেতরটা একটু মোচড় দিয়ে উঠল!

ওরে বাবা! সামনে দেখি আরেক মজমা! জল-জ্যান্ত চলন্ত দৃশ্যটা আমাদের দিকেই এগিয়ে আসছে মহড়া দিতে দিতে! তিন জন নারী, সবার যে পিছনে, তার মাথায় আবার মনে হ’লো একটা ছোট্র সাপের বাক্স! ভেতরে কী আছে আল্লাহ্ মালুম! তার কাঁকে আবার একটা উলঙ্গ শিশুও আছে। তারই সামনে সামনে চলছে আরও দুই জুয়ান ছেমরী, হাতে তাদের ছোট ছোট সাপের বাক্স (দেখে তাই মনে হ’লো)! পথচারীদের দিকে তেড়ে যাচ্ছে আর টাকা-পয়সা চাচ্ছে। অধিকাংশই ওদেরকে এড়িয়ে যাবার চেষ্টা করছে। এরই মধ্যে একটি গাড়ীর কাঁচ খোলা পেয়ে এক ছেমরী তো হাতে ধরা বাক্সটা গাড়ীর ভেতর ঢুঁকিয়ে দিয়েছে! আর সে কী হৈ চৈ! আতঙ্কিত বেগম সাহেবার কান্না-কাটিতে সে কী এক মর্মান্তিক দৃশ্যের অবতারনা! 

কিন্তু কার কী! বরং পথচারী-যাত্রীদের অধিকাংশই দেখলাম, দৃশ্যটি দর্শকের মত দারুন ভাবে উপভোগ করছে! বেগম সাহেবাকে দেখলাম, কোন রকমে ওই ছেমরীর হাতে কিছু গুঁজে দিয়ে বেঁচে যাবার আপ্রাণ চেষ্টা করছে! পাশেই অবশ্য একজন ট্রাফিক পুলিশকে দেখা গেল, দাঁতের  ‍দু’পাটি বের করে মজা পাবার চেষ্ট করছে! মনে হ’লো কোন ছবির সুটিং চলছে আর সবাই মন ভরে সেটা উপভোগ করছে!

সত্যি সত্যি কিন্তু আমার কাছেও সেরকমই মনে হচ্ছিল, কারণ পিছনে পিছনে যে মহিলা আসছিল, তাকে দেখে হঠাৎ করে মুম্বাই ফিল্মের দীপিকা পাডুকোন বলে যে কেউ ভুল করতে ই পারে। ও রকমই লম্বা আর চেহারাটাও দারুন আকর্ষনীয়! দেহের গড়নটাও সে রকমই। গায়ের রঙেও তেমন একটা তফাৎ নেই। বয়সটা হবে হয়তো বা পঁয়ত্রিশ! আর সামনের দুই ছেমরীর বয়স মনে হ’লো পঁচিশ ছুঁই ছুঁই! একটা যেন প্রিয়াঙ্কা চোপরা আর অন্যটা বিদ্যা বালান! বাংলার নায়িকাদের মত ড্যাব-ড্যাবা মনে হয়নি, তাই ওদের কথাই বললাম। পড়নে খুব সাধারণ বাঙালীর শাড়ী বা কাপর বলা চলে। নীচে হাঁটু প্রায় ছোঁয়া ছোঁয়া আর পড়েছে নাভীর এতটাই নীচে যে ওর নীচে আর পড়াই যায়না। সারা গতরে যৌবন উৎলে পড়ছে! হায়রে মানুষ! আর ব্লাউজের কথা কী আর বলব! এতই ছোট যে, ১৯৭৬ সালের সেই সব দিনের কথাই মনে পড়ে গেল, যখন অনেক মহিলাই এরকম করে শাড়ী পড়তো, তার নীচে এমন একটা হাতাকাটা ব্লাউজ পড়তো, মনে হ’তো যেন শুধু একটা ব্রা পড়েই সদ্য স্বাধীন দেশে আধুনিকতা জাহির করতে রাস্তায় নেমে পড়েছে! জানিনা তাদের সন্তানেরা এখন কে কোথায় কী অবস্থায় আছে! তবে সেনা সদস্যগণ তখন কিন্তু তাদের নাভীর উপর দিয়ে আলকাতরা লেপ্টে দিয়ে সে অবস্থা থেকে আমাদের উদ্ধার করেছিল!

দেখতে দেখতে ওরা আমার এতটাই কাছে এসে গেছে যে, আমাদের মাঝে ফারাকটা তখন হয়তো মাত্র পাঁচ ছয়-হাত হবে! বিদ্যা বালানের মত থল-থলে ছেমরীটা নাদুস-নুদুস এক যুবককে পাকড়াও করে কী যে করল তা আর মুখে বলা যায় না! চারিদিকের পথচারীগণ কেউ কেউ মান-সম্মান রক্ষার্থে দ্রুত কেটে পড়ছে, কেউ কেউ আবার দৃশ্যটা উপভোগ করার জন্য বানর খেলা দেখার মত করে গোল হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে! যুবকটার একটাই অপরাধ! সে তাদের কর্মকান্ডের প্রতিবাদ করেছিল! যুবকটার সামনে একবার ঝাঁপির মুখ খুলে সাপের ভয় দেখাচ্ছে, কখনও আবার যা মুখে আসছে তাই বলে অকথ্য ভাষায় বকা-ঝকা করছে! এমন কথাও বলতে ওর মুখে বাধছে না যে, ছেলেটি নাকি ওর বুকে হাত দিয়েছে! হায়! হায়! ছেমরী বলে কী! আবার বলে ব্লাউজ তুলে নাকি ওর মুখের মধ্যে ঢুঁকিয়ে দেবে! ছেলেটি শেষ পর্যন্ত দশটি টাকা বের করে দিতে গেলে জোড় করে বিশ টাকা নিয়ে ওকে ছেড়ে দিল! 

ভাগ্যিস! আমাকে ধরেনি! তাহলে আর উপায় ছিল না! কারণ কাকে ধরা উচিৎ আর কাকে ধরা উচিৎ নয়, সেই জ্ঞানটাও যে ওদের নেই! বয়সটা ওদের কাছে কোন ব্যাপার নয়, টাকাটাই বড়! রাজধানীর প্রকাশ্য রাজপথের ফুটপাতে এখন এরকমই বাংলাদেশের চেহারা! ওই ছেমরীর দোষ কী! বাংলাদেশের প্রায় সবাই তো এখন বৈধ হোক আর অবৈধ হোক, চোখ-কান বন্ধ করে শুধু টাকার পিছনেই ছুটছে ঐসব বেদেনীদের মত করে!


এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

Dhaka, Street, footpath, life, floating, people, crowd, traffic, Woman