সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

south-asian-migrant-crisis.jpg

এ লজ্জার দায় কার একটি হৃদয় বিদারক ঘটনা

রোহিঙ্গারা না হয় চির অসহায়! নিপীড়িত, নির্যাতিত, বঞ্চিত! তারা না হয় অভিবাসী হওয়ার জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়েছে, কিন্তু আমাদের দেশের মানুষ গুলো তো একটা স্বাধীন দেশের নাগরিক, তারা কেন এমন করে ঝুঁকি নেবেন! এইটাই ভাববার বিষয়!

মাত্র কিছুদিনের ব্যবধানে লোকচক্ষুর অন্তরালে ঘটে গেল এক হৃদয় বিদারক ঘটনা! যাকে শতাব্দীর লজ্জা বা কলংক বললে অত্যুক্তি হবে কী? ঝলমলে সভ্যতার পাদ প্রদীপে হাজার হাজার নারী, শিশু, কিশোর, তরুন, যুবক সম্প্রদায কাঠের নৌকা আর মাছ ধরা ট্রলারে চড়ে অসহায়ের মত অকূল সাগরে ভাসছে!

অথচ তাদের নিকটবর্তী কোন দেশ তাদের উপকূলে ভিড়তে বা অবতরণের অনুমতি দিচ্ছে না! পানি ও খাদ্যের অভাবে তারা মৃত্যু মুখে পতিত হচ্ছে আর সবাই নিরবে দর্শকের মত পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ করছে! এর চাইতে অমানবিক আর কী হতে পারে! এটা কোন নাটক বা সিনেমার কাহিনী নয়! এমনই এক মর্মষ্পর্শী চরম বাস্তবতার মুখোমুখী হয়েও আমরা নিরবে সময় ক্ষেপনের অজুহাত খুঁজছি! 

বাংলাদেশ সহ বিশ্বের অনেক দেশের বিভিন্ন ধরণের মিডিয়ার প্রচারণার মুখে এ ঘটনাটি এখন বর্তমান সভ্যতাকে দারুন ভাবে নাড়া দিয়েছে আর সে কারণেই বিশ্ব বিবেক এখন একটু নড়েচড়ে বসেছে। মুখ রক্ষার জন্যে হলেও থাইল্যান্ড, মালযেশিয়া এবং ইন্দোনেশিয়ার সরকারগুলোকে জাতিসংঘ সহ অন্যান্য মানবাধিকার প্রতিষ্ঠানের পক্ষ থেকে অসহায় মানুষগুলোকে তাদের ভূখন্ডে আশ্রয় দেবার জন্য তাগিদ দিয়েছে।

প্রতিদিনের খবরগুলোর মাঝেও নতুন নতুন খবরের জন্ম হচ্ছে, যা দেখে, পড়ে মানুষ হচ্ছে হতভম্ব! গতমাসে থাইল্যান্ডের জঙ্গলে রোহিঙ্গা আর বাংলাদেশীদের গণকবর আবিষ্কৃত হবার পর এ মাসে আবারও মালয়েশিয়াতেও শত শত রোহিঙ্গা ও বাংলাদেশীদের গণ কবরের সন্ধ্যান পাওয়ায় বিশ্বে হৈ চৈ আর তোলপাড় চলছে! মানবাধিকার সংগঠণগুলো এটাকে চরম এক মানবিক সঙ্কট বা মানবিক বিপর্যয় বলেই উল্লেখ করেছে। 

এমন একটা অমানবিক ঘটনার পরিপ্রেক্ষিতে মালয়েশিয়ার মাটিতে বিদেশী মানুষের গণ কবর আবিষ্কৃত হওয়ায় মালয়েশিয়ার প্রধানমন্ত্রী নাজিব রাজাক স্তম্ভিত হয়েছেন, আবার সে দেশেরই স্বরাষ্ট্র মন্ত্রী এবং পুলিশ প্রধান বলেছেন, এ রকম ঘটনা ঘটে চলেছে বিগত পাঁচ বছর ধরেই।

বাংলাদেশের মিডিয়া গুলো বেশ কিছুদিন পূর্ব থেকেই এ ব্যাপারে সবাইকে সজাগ করার চেষ্টা করেছে! অথচ ভাগ্যের কী ‍নির্মম পরিহাস! এই কিছুদিন আগেও মিয়ানমার যখন তাদের দেশ থেকে চির নিপীড়িত ও বঞ্চিত রোহিঙ্গাদের সে দেশ থেকে বিতাড়িত করেছিল তখন আমরাই তাদেরকে আশ্রয় না দিয়ে সাগরের লোনা জলেই আবার ঠেলে দিয়েছিলাম! আর তারা অসহায়ের মত অজানা গন্তব্যে ভেসে ভেসে মৃত্যু মুখে পতিত হয়েছিল!

আজ ঠিক অনুরুপ ভাবেই বাংলা মায়ের সন্তানদেরকেও আশ্রয় না দিয়ে থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া আর ইন্দোনেশিয়ার সরকার বাহাদুরগণ ঠেলে দিচ্ছে অথৈ সাগরে, যার কোন দিগন্ত রেখাও দৃশ্যমান নয়!

বাংলাদেশের প্রায় এক কোটি মানুষ আজ বিশ্বের বিভিন্ন দেশে নিজের এবং পরিবারের ক্ষুন্নিবৃত্তির উদ্দেশ্যে মানবেতর জীবন যাপন করছেন! পক্ষান্তরে তাদের উপার্জিত বৈদেশিক মুদ্রাই আমাদের দেশের সার্বিক অর্থনৈতিক অবস্থাকে শুধু শক্তিশালীই করেনি, উপরন্তু আমরা এখন অনতিবিলম্বে মধ্যম আয়ের রাষ্ট্রে পরিণত হবার স্বপ্নও দেখছি! তাই বলে চোখ কান বন্ধ করে এ রকম ন্যাক্কারজনক মানব পাচার কে প্রশ্রয় দিতে হবে কেন? যে কারণে এত বড় মানবিক বিপর্যয় ঘটার সুযোগ সৃষ্টি হ’লো!

মিয়ানমার, থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া ও ইন্দোনেশিয়ায় কর্মরত আমাদের দেশের রাষ্ট্রদূতদের আশংকা, এ কারণে আমাদের দেশকে কালো তালিকা ভূক্তও করা হতে পারে। এ বিষয়টাকে  আমাদের দেশের সরকারী কর্তৃপক্ষ লজ্জা জনক মনে করেন কিনা আমার জানা নেই, তবে আমাদের দেশের জনশক্তি যে ধ্বংশ হচ্ছে, তাতে তো কোন সন্দেহ নেই নি:সন্দেহে।

আলোচিত দেশগুলোর সরকারী কর্তৃপক্ষ এ ঘটনাকে শ্রেফ মানব পাচারের ঘটনা এবং ভূক্তভোগী বাংলাদেশী ও রোহিঙ্গাদের 'পণ্য' বলে পার পাবার চেষ্টা করছে! 'The Roots' ছবিটি যারা দেখেছেন তাদের মনে থাকবার কথা, সে সময় ইউরোপ এবং আমেরিকার সাদা চামড়ার মানুষগুলো আফ্রিকার কালো মানুষদের কিভাবে ছলে, বলে, কৌশলে গরু, ছাগলের মত গাদাগাদী করে কাঠের নৌকায় ভরে তাদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে নিজেদের দেশে নিয়ে গিয়ে দাস হিসাবে বেচা কেনা করত। কিন্তু তখন তো পৃথিবীতে ঐসব সাদা চামড়ার অত্যাচারী মানুষগুলোর দাপট ছাড়া সভ্যতার কোন আলো ছিল না। কিন্তু আজ তাদেরই রচিত আধুনিক সভ্যতার নাকের ডগায় মানুষ কিভাবে স্বেচ্ছায় বেচা কেনা হবার জন্য 'পণ্যে' পরিণত হচ্ছে, তাও আবার কথিত একটা ডিজিটাল দেশের নাগরিক হয়ে! ভাবতে অবাক লাগে না?

রোহিঙ্গারা না হয় চির অসহায়! নিপীড়িত, নির্যাতিত, বঞ্চিত! তারা না হয় অভিবাসী হওয়ার জন্য জীবনের ঝুঁকি নিয়েছে, কিন্তু আমাদের দেশের মানুষ গুলো তো একটা স্বাধীন দেশের নাগরিক, তারা কেন এমন করে ঝুঁকি নেবেন! এইটাই ভাববার বিষয়!

তবে বাংলাদেশ কে কালো তালিকা ভূক্ত করার আগে সবাইকে ভাবতে হবে, বাংলাদেশের মানব পাচারকারী অপরাধী চক্র কী একতরফা ভাবেই এহেন দুষ্কর্মে জড়িত? থাইল্যান্ড, মালয়েশিয়া, ইন্দোনেশিয়ার অপরাধী চক্র যদি এই অবৈধ কমিশনের বানিজ্যে যুক্ত না হ’তো তবে কী এতবড় মানবিক বিপর্যয় ঘটতে পারতো? তা ছাড়া এই সমস্ত মানুষগুলোর গণ কবর আবিস্কৃত হয়েছে তাদের ভূখন্ডে!

অতএব, এই বিপর্যয়ের দায়িত্ব সবাইকেই নিতে হবে। সবাইকে মিলেই সবদেশের অপরাধীদেরকেই দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দেবার ব্যবস্থা করার পাশাপাশি ক্ষতিগ্রস্থ পরিবারগুলোকে ও ক্ষতিপূরণ দেবার প্রয়োজনীয় উদ্যোগ নিতে হবে।

সবাইকে মনে রাখতে হবে, ভুক্তভোগীরা সফল হলে তাদের শ্রম এবং উপার্জিত আয়ের দ্বারা আলোচিত সবগুলো দেশই উপকৃত হ’তো, যদিও ধরণটা নিন্দিত এবং অবৈধ। অতএব হে বিশ্ব বিবেক জাগ্রত হও, এ লজ্জাকে সমবেত ভাবে মিটিয়ে দেবার তরে!


এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

Rohingya, Migrant, Bangladeshi, Inhumanity, Torture, slavery, life, struggle