সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

modi-bangladesh-visit-2015.jpg

কলাম নরেন্দ্র মোদির বাংলাদেশ সফর: ব্যক্তি মমতার সঙ্গে আসুক শীতল পানির মমতা

অভিন্ন নদীর পানি ন্যায্য বন্টন সংক্রান্ত সমস্যা নিরসনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরই শেষ ভরসা। ভারত ১৯৭৪ সালে স্বাক্ষরিত স্থল সিমান্ত চুক্তি লোকসভায় অনুমোদন করায় বাংলাদেশীদের মনে অবশ্যই আস্থার সৃষ্টি করেছে। তেমনি, বাংলাদেশকে অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা দিতে শুধু শাব্দিক বা মমতা নামের একজন রাজ্য মূখ্যমন্ত্রীকেই বাংলাদেশে সফরসঙ্গি হিসেবে আনলে হবে না; বরং অভিন্ন সকল নদীর পানি বন্ঠন সংক্রান্ত গ্রহনযোগ্য চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে মোদি বাংলাদেশের জনগণকে শীতল পানির মমতা দেবেন এটাই সকলের প্রত্যাশা।

ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদি আগামী ৬ জুন বাংলাদেশে আসছেন। ৩৬ ঘণ্টা অবস্থান করে পরদিন ৭ জুন সন্ধ্যায় দিল্লির উদ্দেশে ঢাকা ত্যাগ করবেন। প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণের পর প্রতিবেশী দেশগুলো সফরের পরিকল্পনা র অংশ হিসেবে তিনি ইতিমধ্যেই নেপাল, ভুটান ও শ্রীলঙ্কা সফর করেছেন। এবার আসছেন বাংলাদেশে। সাথে থাকছেন পশ্চিমবঙ্গের মূখ্যমন্ত্রী মমতাও।

বিশাল ভূখন্ডের বর্তমান বিশ্বের উদীয়মান অর্থনৈতিক শক্তি, পরাক্রমশালী দেশের প্রধানমন্ত্রীর বন্ধুপ্রতীম প্রতিবেশি রাষ্ট্রে আগমণ নি:সন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। মুক্তিযুদ্ধে অসামান্য অবদান ছাড়াও যৌক্তিক বাস্তবতায় বাংলাদেশের রাজনীতি, অর্থনীতি এবং বৈদেশিক নীতিতে ভারতের প্রভাব অস্বীকার করার কোন উপায় নেই। তাই মোদীর সফরের মাধ্যমে বাংলাদেশের জনগণ অনেক অমিমাংসিত সমস্যার সমাধান প্রত্যাশা করবে এটাই স্বাভাবিক। বাংলাদেশের জনগণ প্রত্যাশা করে অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য বন্টন, বাণিজ্য বৈষম্য হ্রাস, ভারতে বাংলাদেশের বইপত্র, টিভি চ্যানেল সম্প্রচারের সূযোগ, সীমান্তে হত্যা বন্ধ, ভারতের উপর দিয়ে অন্যান্য দেশে ট্রানজিট ও ট্রান্সশিপমেন্ট সুবিধা, অবৈধ মাদক ও অস্ত্র পাচার বন্ধ, জঙ্গি ও সন্ত্রাসীদের আশ্রয় না দেয়া ইত্যাদি সমস্যাগুলো দ্রুত কার্যকর সমাধান হোক।

তবে বাংলাদেশের জনগণ সবচেয়ে দ্রুত যে অমিমাংসিত সমস্যার সমাধান চায় সেটি হলো অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য বন্টন। মোটাদাগে ‘ফারাক্কা ব্যারেজ’, ’গজলডোবা ব্যারেজ’, মহানন্দা ব্যারেজ, ’মেইডং ড্যাম’ এবং ‘টিপাইমুখ ড্যাম’ সমস্যার আশু সমাধান দেখতে চাই আমরা।

একদিকে বিএসএফ’র বাধার মুখে দেশের অধিকাংশ সীমান্ত নদীর রক্ষণাবেক্ষণ, সংস্কার ও খনন কাজ বন্ধ রয়েছে। অন্যদিকে, ভারত এরই মধ্যে অভিন্ন ৫৪টি নদীর ৪২টিতে বাঁধ দিয়েছে। বাঁধের মাধ্যমে শুষ্ক মৌসুমে পানি আটকিয়ে, আর বর্ষার সময় এসব বাঁধের মুখ খুলে দিয়ে বাংলাদেশের বিশাল জনগোষ্ঠীকে ভয়াবহ দুর্যোগের কবলে ঠেলে দিচ্ছে। এসব কারণে বিপর্যয় নেমে এসেছে ভাটির বাংলাদেশে।

সীমান্ত নদীর উজানে বাধার কারণে শুকনো মৌসুমে প্রবাহবিহীন হয়ে পড়ে অধিকাংশ নদী। বিভিন্ন সংবাদ মাধ্যম থেকে প্রাপ্ত তথ্যানুযায়ী দেখা যায়, শুধুমাত্র ফারাক্কার বিরুপ প্রভাবে পদ্মা, গড়াই নদীসহ ১৮টি নদী পানি শুন্য হয়ে পড়েছে। পদ্মা এবং তার শাখা-প্রশাখা ১৯৬০ সালের তুলনায় নাব্যতা হারিয়েছে ৭০%। এককালের প্রমত্তা মধুমতি-গড়াই বর্তমানে ক্ষীণ ধারায় প্রবাহমান। আশির দশকে গড়াই একবার সম্পূর্ণ শুকিয়ে গিয়েছিল। পদ্মায় পানি শুন্যতার কারনে হার্ডিঞ্জ ব্রিজের ১৫টি স্প্যানের মধ্যে ১১টি স্প্যান শীর্ণ ঠাঁয় দাড়িয়ে আছে ধূ ধূ বালুর উপর। বৃহত্তর কুষ্টিয়ায় পানির অভাবে কৃষি আবাদে দেখা দিয়েছে মরুময়তা। কুষ্টিয়া, ঝিনাইদহ, মেহেরপুর, চুয়াডাঙ্গা, মাগুরা ও যশোর জেলার ১৩টি উপজেলায় ১লাখ ১৬হাজার হেক্টর জমিতে আবাদ হুমকির সম্মূখীন হয়ে  পড়েছে।

শুষ্ক মৌসুমে দেশের উত্তর ও পশ্চিমাঞ্চলে পানির অভাবে নদীগুলো যখন মরা গাঙ, নদীর বুকে ধূধূ বালুচর, পাম্প বসিয়েও পানি তোলা যায় না, তখন ২হাজার ৫২৫ কিলোমিটার দৈর্ঘের গঙ্গা নদীর অববাহিকায় ভারত ১কোটি ৩০লাখ হেক্টর জমিতে সেচের ব্যবস্থা করেছে। অন্যদিকে দেশের বৃহত্তম গঙ্গা-কপোতাক্ষ (জিকে প্রজেক্ট) সেচ প্রকল্প যার আওতায় ১লাখ ৪২হাজার একর আবাদি জমি রয়েছে, পাবনা সেচ ও পল্লী উন্নয়ন প্রকল্প, পানাসি (পাবনা-নাটোর-সিরাজগঞ্জ) প্রকল্প, বরেন্দ্র প্রকল্পসহ বিভিন্ন প্রকল্পের হাজার হাজার একর জমিতে অত্যাধুনিক প্রযুক্তি ও পাম্প বসিয়ে সেচ দেয়া সম্ভব হচ্ছে না।

একইভাবে তিস্তার ভারত অংশে গজলডোবা ব্যারেজের সবকটি গেট বন্ধ করে দেওয়ায় খরস্রোতা তিস্তা নদী এখন মরা নদীতে পরিনত হয়েছে। ফলে দেশের সর্ববৃহৎ সেচ প্রকল্প তিস্তা ব্যারেজের সেচ কার্যক্রমও অকার্যকর হয়ে পড়েছে। সূত্রমতে, সেচ প্রকল্পের পানিসহ তিস্তাকে বাঁচিয়ে রাখতে নূন্যতম পানির প্রয়োজন প্রায় ২০হাজার কিউসেক। কিন্তু ৩ এপ্রিল ২০১৪ তারিখে তিস্তা ব্যারেজ প্রকল্প এলাকায় পানির পরিমান ছিল মাত্র ২শ কিউসেক। (বাংলাদেশ প্রতিদিন, ৪ এপ্রিল ২০১৪)

তিস্তার পানি চলতি শুষ্ক মৌসুমেও সর্বকালের সর্বনিম্ন স্তরে নেমেছিল। গত কয়েক বছর যাবত শুষ্ক মৌসুমে তিস্তায় পানি প্রবাহ না থাকায় এর শাখা নদীগুলোও মরে গেছে। উজানে তিস্তা নদীর পানিকে আটকিয়ে রাখতে ভারতের দেয়া গজলডোবা ব্যারেজ এ অঞ্চলের ছোট-বড় মিলিয়ে প্রায় ৩০টি খরস্রোতা নদীকে বিলীন করে দিয়েছে। গজলডোবা ব্যারেজের কারণে শুধু নদীই নয়, তিস্তা নদীবেষ্টিত লালমনিরহাট, কুড়িগ্রাম, নীলফামারী, রংপুর জেলায় ভয়াবহ রূপ নিয়েছে মরুকরণ প্রক্রিয়া।

ভারত কর্তৃক ব্যারেজ, ড্যাম দেওয়া প্রতিটি নদ-নদীর চিত্র একই ধরনের। এখানেই শেষ নয়, নদ-নদীতে পানি শুন্যতার জন্য দেশের অনেক অঞ্চলে পানির স্তর নিচে নেমে গেছে। ইতিমধ্যে পত্রিকায় খবর বেরিয়েছে দক্ষিণাঞ্চলে পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় ডিপটিউবওয়েল থেকেও পানি পেতে বেগ পেতে হচ্ছে। তিস্তা অববাহিকায়ও পানির স্তর নিচে নেমে যাওয়ায় নলকুপেও তেমন পানি উঠছে না। বেড়েছে মাটির লবনাক্ততা। এছাড়া নদীগুলোতে ব্যারেজ, ড্যাম দেওয়ার মাধ্যমে ভারতের একতরফা পানি অপসারণের ফলে বাংলাদেশের মাটি ও পানি সম্পদ, মৎস্য ও জলজ সম্পদ, সুন্দরবন,  পরিবেশ, জীববৈচিত্র ও সর্বোপরি আর্থসামাজিক অবস্থার অপূরনীয় ক্ষতি হয়েছে । এভাবে চলতে থাকলে অদূর ভবিষ্যতে বাংলাদেশের অবস্থা কি হবে, ভাবতে গা শিহরিত হয়ে উঠে।

সমস্য ভয়াবহ হলেও গঙ্গার পানি বন্টন চুক্তি ছাড়া পানি বণ্টন নিয়ে এখন পর্যন্ত আর কোন চুক্তিতে উপনিত হতে পারেনি বাংলাদেশ। গঙ্গার পানিবন্টন চুক্তি স্বাক্ষর হলেও ১৯৯৬ সালে পর ১৯ বছর পার হতে চললেও দু-একবার বাদে বেশিরভাগ সময়ই ভারত-বাংলাদেশকে কম পানি দিয়ে আসছে। গঙ্গা চুক্তি অনুযায়ী প্রতিবছর জানুয়ারী থেকে মে এই ৫ মাসে মোট ১৫ টি পর্যায়েই সংরক্ষিত হবার কথা। কিন্তু ২০০৮ সাল থেকে ২০১১ সাল পর্যন্ত ৪ বছরের উপাত্তের ভিত্তিতে দেখা যাচ্ছে যে শতকরা ২৫ ভাগ সময়েই চুক্তি অনুযায়ী পানি পাচ্ছেনা বাংলাদেশ। সেই সাথে আরো দেখা যাচ্ছে হিস্টরিকাল প্রবাহ অনুযায়ী বাংলাদেশে গঙ্গার প্রবাহ ক্রমান্বয়ে কমে যাচ্ছে, উল্লেখিত  ৪ বছরে জানুয়ারী থেকে মে পর্যন্ত সময়কালে শতকরা ৮৫ ভাগ সময়ে হিস্টরিকাল প্রবাহ অনুযায়ী বাংলাদেশ পানি পাচ্ছেনা। এভাবে ক্রমাগত ভাবে যদি ফারাক্কাতে গড় প্রবাহ এই হিস্টরিকাল প্রবাহ থেকে কমে যেতে থাকে তা নি:সন্দেহে উদ্বেগের কারণ। (সূত্র: বিডিনিউজ২৪)

তবে  তিস্তার পানি বণ্টন নিয়ে ২০১০ সালের জানুয়ারিতে প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার ভারত সফরে দ্বিপক্ষীয় বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। এই বৈঠকের সিদ্ধান্ত অনুযায়ী ২০১০ সালের ১৭ মার্চে নয়াদিল্লীতে জেআরসির ৩৭তম বৈঠকে তিস্তাসহ অভিন্ন নদীর পানিবণ্টন চুক্তিসহ বিভিন্ন বিষয়ে আলোচনা হয়। জেআরসি’র ৩৭তম বৈঠকে বাংলাদেশ সমতা, ন্যায়ানুগতা ও পারস্পরিক ক্ষতি না করার নীতির ভিত্তিতে ১৫ বছরের জন্য তিস্তা নদীর একটি অন্তর্বর্তীকালীন চুক্তির খসড়া উপস্থাপন করে। একইভাবে ভারতের পক্ষ থেকেও তিস্তার পানিবণ্টন নিয়ে একটি খসড়া উপস্থাপন করা হয়। কিন্তু বাস্তবতা হচ্ছে, সেই চুক্তির খসড়া  আজও আলোর মুখ দেখেনি। এমনকি নিয়ম অনুযায়ি ৬ মাসের মাথায় জেআরসি’র ৩৮তম ফিরতি বৈঠকটি অনুষ্ঠিত হওয়ার কথা ছিল ঢাকায়। কিন্তু ভারতের অনিহার কারণে বিগত পাঁচ বছর যাবত জেআরসি’র বৈঠক হয়নি। ভারতের প্রয়োজন ছিল বলেই ১৯৭৪ সালে ফারাক্কা ব্যারাজ চালুর বিষয়ে বাংলাদেশকে সম্মত করতে ভারতের তাগিদেই জেআরসি গঠনের মাত্র দুই বছরের মধ্যে ৭টি বৈঠক অনুষ্ঠিত হয়। ফারাক্কা ব্যারাজ চালু হওয়ার পর থেকেই এ কমিশনের বৈঠক বিষয়ে ভারত আর আগ্রহ দেখায়নি। তাই দেখা যায় ১৯৭৪ সালে পরে ৪১ বছরে সাকল্যে বৈঠক হয়েছে মাত্র ৩০টি। এ থেকে পানি বন্টনের ব্যাপারে ভারতের সদিচ্ছা কতটুকু তা সহজেয় অনুমান করা যায়।

এমতাবস্থায় অভিন্ন নদীর পানি  ন্যায্য বন্ঠন  সংক্রান্ত সমস্যা নিরসনে ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদির সফরই শেষ ভরসা। ভারত ১৯৭৪ সালে স্বাক্ষরিত স্থল সিমান্ত চুক্তি লোকসভায়  অনুমোদন করায় বাংলাদেশীদের মনে অবশ্যই আস্থার সৃষ্টি করেছে। তেমনি, বাংলাদেশকে অভিন্ন নদীর পানির ন্যায্য হিস্যা দিতে শুধু শাব্দিক বা মমতা নামের একজন রাজ্য মূখ্যমন্ত্রীকেই বাংলাদেশে সফরসঙ্গি হিসেবে আনলে হবে না; বরং অভিন্ন সকল নদীর পানি বন্ঠন সংক্রান্ত গ্রহনযোগ্য চুক্তি সম্পাদনের মাধ্যমে মোদি বাংলাদেশের জনগণকে শীতল পানির মমতা দেবেন এটাই সকলের প্রত্যাশাই ।

-
লেখক: কবি, সাংবাদিক ও কলামিস্ট, kbasher74@gmail.com


এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

Modi, Indian, Prime, Minister, Hasina, Mamata, Tista, Water, Barrage, Right, Visit