সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

turkey-syria.jpg

রোড টু সিরিয়া প্রবাসে বাঙ্গালী কমিউনিটির আতঙ্ক

নাজমুল হোসেন, লন্ডন থেকে: সম্প্রতি প্রবাসে বাঙ্গালী কমিউনিটিতে আতঙ্কিত হওয়ার মতো একটি সংবাদ পত্রিকায় প্রকাশ হয়েছে । ব্রিটেনে রেহেনা বেগম নামের ৩৩ বছর বয়স্ক একজন বাংলাদেশী বংশোদ্ভূত বাঙালী মা তার আট বছরের ছেলে আর তিন বছরের কন্যা সন্তানকে নিয়ে তুরস্কের ইস্তাম্বুল থেকে বর্ডার হয়ে সিরিয়া গমন করেছেন আইএসে অংশ নেয়ার জন্য।

এটাই প্রথম ঘটনা নয়, এর আগেও শামীমা, খাদিজা ও সারমীন নামের ৩জন বাঙালী তরুণীও ব্রিটেন থেকে আইএস জিহাদীদের সাথে শরীক হওয়ার জন্য ঘর ছেড়ে পালিয়েছেন।

শুধু ব্রিটেনেই নয়, কয়েকদিন আগেই জানা গিয়েছে ৪ জন কানাডীয় বাংঙ্গালীও একই পথে তাঁদের পা বাড়িয়েছেন। এসব সংবাদ বিভিন্ন ইংরেজী গনমাধ্যমে ফলাও করে প্রচারের ফলে তোলপাড় শুরু হয়েছে বিভিন্ন দেশে। আর তাই প্রবাসী বাংলাদেশী কমিউনিটিতে ব্যাপক উদ্বেগ- উৎকণ্ঠা ছড়িয়ে পড়ে।

ব্রিটেনের তরুণীদের আইএসে যোগদানের পুরো ঘটনা এখনও জানা যায়নি, তবে জানা গিয়েছে মোহাম্মদ আল-রাশেদ নামের একজন সিরিয়ানের সহযোগিতায় শামীমা, খাদিজা ও রেহেনা বেগম তার শিশু সন্তানদের নিয়ে সিরিয়া গমন করেছেন। রশিদ পুলিশকে জানিয়েছে সে ব্রিটিশ যোদ্ধাদের সিরিয়া যেতে সাহায্য করছে ।

এ বিষয়ে বিস্তারিত কিছু জানা না গেলেও, কানাডীয় বাংলাদেশীদের গমনের বিস্তারিত তথ্য উৎঘাটন করা সম্ভব হয়েছে। আর এ বিস্তারিত তথ্য মানুষকে জানানোর দাবী রাখে, যাতে সবাই সচেতন হতে পারে। কেননা শুধু ব্রিটেন বা কানাডা থেকেই নয় ইউরোপ, আমেরিকা, আফ্রিকা ও এশিয়ার বিভিন্ন দেশ থেকে চলছে তাদের লোকবল সংগ্রহের প্রচারনা। কিছু দিন আগেই আইএস ভারতবর্ষে তাদের কার্যক্রম ঘোষণা করেছে আর অতি সম্প্রতি ৮ জন ভারতীয় তাদের হয়ে যুদ্ধ করতে গিয়ে নিহত হয়েছে বলে খবরে প্রকাশ হয়েছে। 

কানাডীয় বাংলাদেশীদের আইএসে গমন:
ইসলাম ধর্ম গ্রহণকারী এন্ড্রু পলিন ওরফে আবু মুসলিম (মুসলিম হওয়ার পরের নাম) নামের এক সাদা কানাডীয়র সাথে ২০১১ সালে দেখা হয় কানাডার চার কিশোর তাবিরুল হাসিব, আবদুল মালেক, নুর ও আদিবের। এই চার কিশোরের সবার জন্মই কানাডায়। তখন এন্ড্রুর মাত্র ২০ বছর বয়স, তার পরনে ছিল টুপি ও লম্বা তোপ।

কিছু দিনের মধ্যেই এই এন্ড্রু হয়ে উঠে এ চারজনের ইমাম বা ধর্মীয় গুরু এবং তারা গোপনে সপ্তাহে ১/২ দিন সাক্ষাৎ করতো আর কি যেন আলাপ করতো লোক চক্ষুর অন্তরালে।

২০১২ সালের শেষদিকে চার কিশোর মধ্যপ্রাচ্যের জন্য টিকেট বুকিং দিয়ে একদিন হাওয়া হয়ে গেল কাউকে কিছু না বলে। এ ঘটনায় তাদের উদ্বিগ্ন বাবা-মা কানাডার পুলিশকে অভহিত করে। হঠাৎ একদিন আবদুল মালেক তার বাসায় ফোন করে জানায়, 'তারা নিরাপদে আছে। এখন তারা লেবানন, উদ্দেশ্য তাদের সিরিয়া।'

সিরিয়ায় অভিভাবকদের গমন:
এমন জরুরী অবস্থায় আবদুল মালেকের বাবা ও নুরের বাবা সব অভিভাবকের সাথে আলোচনা করে তাড়াতাড়ি ২০১৩ সালের ফেব্রুয়ারি মাসে কানাডা থেকে লেবানন গেলেন। সেখানে গিয়ে শুনলেন এন্ড্রু পলিন ওরফে আবু মুসলিমের নেতৃত্বে তারা লেবানন হয়ে সিরিয়া যেতে চেয়েছিল। পরে তারা বুঝিয়ে তাদের সন্তানদের ফিরিয়ে আনে কানাডায়।

কিন্তু রয়ে যায় এন্ড্রু পলিন, সেখান থেকে কিছুদিনের মধ্যে সে সিরিয়ায় ঢুকে জাবাত আল নুসরার সাথে যোগ দিয়ে বাসার- আল- আসাদের সরকার উৎখাতে যুদ্ধ শুরু করে।

২০১৩ সালের গ্রীষ্মে উত্তর সিরিয়ায় আইএসের হয়ে যুদ্ধ করতে গিয়ে নিহত হয় এন্ড্রু।

কানাডায় তারা:
অন্যদিকে, সেই চার কিশোর তাবিরুল হাসিব, আবদুল মালেক, নুর ও আদিবকে লেবানন থেকে বুঝিয়ে কানাডায় ফিরিয়ে এনে জব্দ করা হয় তাদের পাসপোর্ট যাতে আবার সটকে যেতে না পারে। এর মধ্যে তাদের কেউ কেউ ভর্তি হয় কমিউনিটি কলেজে। আর সবাই ফিরে এসেছিল স্বাভাবিক জীবনে। তবে তারা নিজেদের গুটিয়ে নিয়েছিল সমাজ থেকে। 

আবারও উধাও:
কিন্তু ৬ জুলাই, ২০১৪ এবার কিছু না বলে আবারও উধাও। কিছুই জানে না অভিভাবক বা বন্ধুরা। এবার তারা মোহাম্মদ আলী ওরফে আবু তউরাব নামের এক ব্যক্তির সঙ্গে তুরস্কের উদ্দেশে টরন্টো বিমানবন্দর ছাড়ে।

এন্ড্রু পলিন ওরফে আবু মুসলিমের সাথে এ আবু তউরাবের পরিচয় হয়েছিল ২০০৯ সালে এক জনপ্রিয় ওয়েব সাইটের মাধ্যমে। আবু তউরাবের আসল নাম মোহাম্মদ আলী। এন্ড্রু মোহাম্মদ আলীকে পরামর্শ দিয়েছিল, সিরিয়া যাওয়ার আগে যাতে কিছু টাকা নিয়ে যায় চাকুরী করে বা ব্যাংক থেকে ১০ হাজার ডলার ঋণ করে। ধারনা করা হয় মোহাম্মদ আলী কানাডা থেকে সিরিয়া কয়েকবার আসা যাওয়া করেছে।

১৩ই জুলাই ২০১৪ ইস্তাম্বুল থেকে এক টুইটার বার্তা দেন এই মোহাম্মদ আলী। এতে লেখা ছিল '' আমরা কানাডার এন্ড্রু পলিন ওরফে আবু মুসলিমের বন্ধু, আমরা এখন তুরস্কে, কোন পথে আমরা সিরিয়া আসবো এবং ইসলামিক ষ্টেটে অংশ নিব'' ।

সেই থেকে কারো কোন হদিস নেই, তাদের অনলাইন প্রোফাইলও খুঁজে  আর পাওয়া যায়নি।

হঠাৎ গতবছরের নভেম্বরের শেষদিকে তাবিরুল হাসিব বাসায় ফোন করে। তার মার মনে আছে সেই তারিখ এবং সময়ের কথা এখনও। সে শুধু 'মা' বলে ডেকেছিল। মা যখন জিজ্ঞেস করে সে কোথায়, কোন উত্তর নাই ছেলের। মা কান্নায় ভেঙ্গে পড়ে। আর কোন কথা বলতে পারেননি তিনি।

কারো অভিভাবকই জানে না এখন তার কলিজার টুকরা সন্তান কোথায়। সিরিয়ায়, ইরাক, নাকি লেবানন নাকি গাঁজায়?

তবে, সেই এন্ড্রু পলিন নিহত হওয়ার আগে সে পাশ্চাত্যের তরুণদের আকর্ষণ করে আইএসে যোগদান করার জন্য একটি ১১ মিনিটের একটি ভিডিও নির্মাণ করেছিল। আর ওই ভিডিওচিত্র প্রকাশ করে আইএস কিছুদিন আগে। সেই ভিডিও বিশ্লেষণ করে অভিভাবকরা সম্প্রতি জানতে পেরেছে তাদের ছেলেরা সিরিয়া আছে।

কিন্তু জানা নাই তাঁদের আদৌ সন্তানরা কি জীবিত না মৃত ?

এমতবস্থায়ও পুলিশ ও গোয়েন্দা বিভাগের লোকজন ঘন ঘন তাদের জিজ্ঞাসাবাদ করছেন। প্রতিবেশী ও নিরাপত্তা বাহিনীর কড়া প্রশ্ন ও সমালোচনার মোকাবেলা করতে হচ্ছে তাদের।

কে বা কারা দায়ী এর জন্য ? এর উত্তরে, তারা শুধু জানে তাদের সন্তানদের 'ব্রেইনওয়াস' বা 'মগজ ধোলাই' আজকের এই সমস্যার কারন। তারা বিশ্বাস করে কেউ এই ব্রেইনওয়াসের জন্য দায়ী। যদিও এ 'ব্রেইনওয়াস' পরিবার থেকে হয়নি কিন্তু পরিবারকেই ভুগতে হচ্ছে আজ সবচেয়ে বেশী।

কিন্তু তাঁরা একদিন সন্তানের মঙ্গলের জন্য ও নিজেরা একটু ভাল থাকার আশায় বাংলাদেশ থেকে কানাডায় মাইগ্রেশন করেছিল। এখন কোনটাই হলো না তাঁদের।

তবুও তাঁরা প্রতীক্ষায় প্রহর গুণছেন, তাঁদের কলিজার টুকরা সন্তানদের ঘরে ফেরার। তবে তাঁরা জানে না কবে হবে এ প্রতিক্ষার শেষ, বা আদৌ হবে কিনা শেষ ?

এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

War, Conflict, Community, Bengali, Syria, Turkey, ISIS, News