সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

wrong-bangla-use.jpg

ইংরেজি বললেই কি তাকে বিদ্বান বলে?

আমরা ভাষা দিবসে গেয়ে উঠি ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ আর দিবস শেষ হতে না হতেই গেয়ে উঠি ‘লুঙ্গি ড্যান্স লুঙ্গি ড্যান্স’! আবার পহেলা বৈশাখে গলা ফাঁটিয়ে গেয়ে উঠি ‘ও সখিনা গেছস কিনা ভুইলা আমারে’ আর পরের দিন সখিনারে তাড়িয়ে দিয়ে শিলাকে নিয়ে আসি!

গত ১২ মে বর্ণমালা সিম কেনার জন্য চট্টগ্রামের দামপাড়ায় টেলিটক কাস্টমার কেয়ারে গেলাম। যদিও রেজিস্ট্রেশন করার দুইমাস পর সিমটা পাচ্ছি তবুও আনন্দিত ছিলাম। প্রয়োজনীয় কাগজপত্র যা লাগে তা নিয়ে গেলাম। কিন্তু বিপত্তি ঘটলো নম্বরপত্রের ফটোকপি নিয়ে। অনলাইন থেকে প্রিন্ট করা নম্বরপত্র চলবেনা! কেন চলবেনা জানতে চাইলে উপযুক্ত কারণ বলতে তারা ব্যর্থ। তবে তাদের একটাই কথা চলবেনা।

তাদের কথা আপনার রোল জেনে যে কেউ প্রিন্ট করে নিয়ে আসতে পারে। আমি তখন বললাম আমার জাতীয় পরিচয়পত্র, ছাত্র পরিচয়পত্র এসব কোথায় পাবে? তাছাড়া আমরা এসব দিয়ে ভর্তি পরীক্ষাসহ যাবতীয় কাজ করি।

এভাবে এক সময় ঐ কাস্টমার কেয়ারে থাকা সর্বোচ্চ দায়িত্বপ্রাপ্ত জনৈক ভদ্র মহিলার সাথে ঝগড়া বেঁধে গেল। মহিলার মাথা গরম হল। তাই বাংলা ভাষা ভুলে গেলেন! ইংরেজিতে কথা বলা শুরু দিলেন! আমি ভাবলাম আমি ইংরেজি বললে হয়ত সিম দিবে। উনি হয়ত আমার ছাত্রত্বের পরিচয় নিচ্ছেন! আমিও দুই লাইন ইংরেজি বলা শুরু দিলাম। এরপর মহিলা শান্ত হলেন। তখন তার মুখ দিয়ে মাতৃভাষা বাংলা বের হল।

এটা সেই বাংলা ভাষা যা বলার জন্যই রাজপথে আমাদের শ্রদ্ধাভাজনরা আত্মত্যাগ করেছিলেন। পৃথিবীর আর কোথাও ভাষার জন্য জীবন দেয়ার ইতিহাস নেই। পরে মহিলাকে বলে আসছিলাম আমাদের দেশের একজন ক্ষেতের কৃষকও আজকাল ইংরেজি দুই এক লাইন হলেও জানে। আর আপনি ইংরেজিতে রাগ দেখালেন কিন্তু আমি ইংরেজি না বুঝলে আপনার ইংরেজি বলায় কি লাভ হত? যে কানে শোনে না তাকে হাজারো গালি দিলেও কানে ঢুকবে না। সিম কিন্তু সেদিন পাইনি। যাতায়াত সহ দুইশত টাকা না ফুরিয়ে মাত্র ৫০ টাকায় কি সিম পাওয়া যায়?
 
আরেকটি ঘটনা। আমার বন্ধু শাহরিয়ার তার মোবাইল ফোন সার্ভিসিং এর জন্য চট্টগ্রামের রিয়াজুদ্দিন বাজারে যাবে। আমি বিকেলে এদিক সেদিক ঘুরছিলাম। ছাত্র বলতে যে আলাদা পোশাক তাতো আমার শরীরে ছিল না। শাহরিয়ার আবার হুজুর। আমরা দু’জনে গেলাম। দেখে হয়ত মোবাইল মেকার ভাবলেন আমরা পড়ালেখা কিছুই জানি না। লোকটি মোবাইলটি ঠিক করতে পারছিল না। এক সময় আমি বললাম ফ্লাস দিয়ে দিলেই ঠিক হবে মনে হচ্ছে। এই কথায় উনি ইংরেজি ভাষা জাহির করতে আরম্ভ করলেন! বিদ্যা বুঝি ইংরেজিতেই প্রকাশ করতে হয়! আর ইংরেজি বললেই বুঝি মোবাইল ঠিক হয়ে যায়! তাই বাধ্য হয়ে আমিও বলা শুরু করলাম। এবার উনারও বোধদয় হল। বাংলায় বলা শুরু দিলেন। পরে কিন্তু ফ্লাস দিয়েই মোবাইলটা ঠিক করতে হয়েছিল। নিজেকে তখন বড় ইঞ্জিনিয়ার মনে হচ্ছিল।

যাইহোক, ইংরেজিতেই আমাদের বিদ্যা জাহির করতে হবে কেন? আমি বলব না ইংরেজি শেখা থেকে আমাদের দূরে থাকতে হবে। তবে ইংরেজি বলতে পারলেই কি তাকে বিদ্বান বলা হবে? আমাদের ইংরেজি শেখার অবশ্যই দরকার আছে। সেই সাথে ইংরেজি ভাষার প্রতি কৃতজ্ঞতাও প্রকাশ করতে হবে। ইংরেজি ভাষা উপকারে লাগে দেখেই বাংলাকে অবজ্ঞা করতে হবে কেন? এখন ধরুন কোন লোক আপনার উপকার করেছে। যে উপকারটি আপনার বাবাও হয়ত করেনি। এর মানে কি আপনি কৃতজ্ঞতা প্রকাশে সেই উপকারী ব্যক্তিকেই বাবা বলে ডাকবেন? আমি মনে করি বাংলাকে সন্মান দেখিয়ে আপনি যেকোন ভাষা ই শিখতে পারেন।

আমরা বিভিন্ন দিবস পালন করি। আমার মনে এই দিবসগুলো থাকায় বছরের একটি দিন হলেও সেইদিনের সেই বিষয়কে স্মরণ করা হয়। যদি না থাকত তবে সেটাও হয়ত করতাম না। তাইতো আমরা ভাষা দিবসে গেয়ে উঠি ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙ্গানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ আর দিবস শেষ হতে না হতেই গেয়ে উঠি ‘লুঙ্গি ড্যান্স লুঙ্গি ড্যান্স’! আবার পহেলা বৈশাখে গলা ফাঁটিয়ে গেয়ে উঠি ‘ও সখিনা গেছস কিনা ভুইলা আমারে’ আর পরের দিন সখিনারে তাড়িয়ে দিয়ে শিলাকে নিয়ে আসি!

বাংলা ভাষা বিকৃত করছে এফএম রেডিও, যততত্র ভুল বানানের ছড়াছড়ি এমন হাজারো সংবাদে আমাদের মিডিয়া তোলপাড় হয় ফেব্রুয়ারি মাস এলে। এসবের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেয়ার কথাও শোনা যায় অনেক। কিন্তু মাস পেরুলেই সব শেষ। একটু মজা করি। আমার এখন মনে হচ্ছে এই লেখাটাও প্রকাশের জন্য প্রকাশকরা প্রশ্ন করে বসবেন কিনা এটা কি ফেব্রুয়ারি মাস?

আর বেশি কথা বলছিনা। বললেই তো আবার বলবেন হাজী সাহেবের মুখ খারাপ! শুধু বলছি বাংলা ভাষার জন্য বড় বড় বুলিগুলো শুধু ফেব্রুয়ারি মাসে না ছেড়ে তা কাজে-কর্মে সারা বছর জুড়েই দেখাতে হবে। আর রাগ উঠলেই ইংরেজিতে বিদ্যা জাহির না করে শুদ্ধ বাংলায় ঠান্ডা মাথায় কথাগুলো বোঝাতে হবে। মনের ভাব প্রকাশে জন্মের পর থেকে মায়ের শেখানো ভাষার চেয়ে আর কোনটা কি উত্তম হতে পারে?

-
লেখক: ইন্টার্ণশীপ শিক্ষাথী, চট্টগ্রাম ভেটেরিনারি ও এনিম্যাল সাইন্সেস বিশ্ববিদ্যালয়।

এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

Crisis, Identity, language, pride, wrong, culture, patriotism