সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

আঞ্চলিক ইতিহাস

একটি নৃশংস ইতিহাস

মার্কিন সাম্রাজ্যবাদীদের স্বরূপ


ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে ইউরোপের ভৌগোলিক আবিস্কারকগণ রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় নতুন নতুন ভূখন্ড আবিস্কারের নেশায় অনেক সাগর মহাসাগর পাড়ি দিয়ে ইতিহাসের পাতায় পাতায় 'হিরো' হয়ে আছেন, কিন্তু তারা ছিলেন মূলতঃ জলদশ্যু, ভূমিদশ্যু এবং পরে খুনি ও লুটেরা! আমেরিকা আবিস্কারের পরে ইউরোপিয়ানরা চেয়েছিলেন সেখানকার সোনা আত্মসাৎ করতে!


বীর মুক্তিযোদ্ধা, কবি, লেখক, প্রাবন্ধিক । ১৪ মে ২০১৫, ২২:২৯


বর্তমান বিশ্ব রাজনীতিকে যারা প্রভাবিত ও নিয়ন্ত্রন করার চেষ্টা করছে সেই যুক্তরাষ্ট্রকেই এক সময় ব্রিটিশদের কাছ থেকে স্বাধীনতা লাভের জন্য সশস্ত্র সংগ্রাম করতে হয়েছিল। কারণ তারা ছিল ব্রিটিশেরই উপনিবেশ! যদিও মার্কিনীরা বিষয়টিকে এখন পারতপক্ষে উপেক্ষাই করতে চায়! 

আমেরিকার বর্তমান প্রেসিডেন্ট বারাক ওবামার পূর্ব নাম ছিল বারাক হোসেন ওবামা। তিনি ছিলেন মুসলমান পিতার ঔরষজাত সন্তান! আমেরিকার সংবিধান ক্যাথলিক খ্রীষ্টান ধর্মের বাইরের কাউকে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হবার অধিকার অনুমোদন করে না! আর নির্বাচিত প্রেসিডেন্টকে পবিত্র বাইবেলে হাত রেখে শপথ বাক্য পাঠ করতে হয়! সে কারণেই বারাক হোসেন ওবামা ইসলাম ধর্ম ত্যাগ করে খ্রীষ্টান ধর্ম গ্রহণ করেন! এমনকি আমেরিকার অর্থনীতিতে যাদের অবদান সবচেয়ে বেশী সেই ইহুদী ধর্মাবলম্বীরাও স্বনামে আমেরিকার প্রেসিডেন্ট হবার যোগ্যতা রাখে না!

আমেরিকার সাদা চামড়ার মানুষেরাই মূলতঃ আমেরিকান জনগোষ্ঠীর মূলধারা। তারাই সে দেশের রাজনীতি, অর্থনীতি, সমাজনীতি সহ প্রায় সকল অঙ্গনকেই নিয়ন্ত্রণ করে! কারণ তারাই সে দেশের সংখ্যাগরিষ্ঠ ভোটার। যদিও তারা আমেরিকার ভূমিপুত্র নয়! আমেরিকা ছিল সে দেশের আদিবাসীদের ভুখন্ড, যাদের গায়ের রঙ ছিল বাদামী। 

ওরা ছিল অনগ্রসর আর অসংগঠিত, যারা তাদের নিজস্ব ভুখন্ডের বাইরের দুনিয়া সম্পর্কে কোন ধারণাই রাখতো না। অথচ ওরাই সে দেশে সবচাইতে বেশী উপেক্ষিত এবং নিগ্রহের শিকার! এই আমেরিকাই গণতন্ত্রের উদ্ভাবক এবং ধারক-বাহক! ধর্মনিরপেক্ষ নীতি যাদের রাষ্ট্রীয় নীতি হিসাবে সংবিধানে লিপিবদ্ধ বিষয় বস্তু। এটাই হ’লো আমেরিকার উপরিকাঠামোর দৃশ্যমান দর্শন! যদিও উল্টোপিঠের চিত্র সম্পুর্ন ভিন্নরূপ! আর সেখানেই মার্কিনীদের স্বরূপ নিহিত।

কথায় বলে, কান টানলে মাথা আসে, সেই রকম আমেরিকানদের স্বরূপ উন্মোচন করতে হলে তাদের ইতিহাসকে সামনে নিয়ে আসতে হবে, আর তা করতে গেলে ইউরোপকে নিয়ে মাথা ঘামানোর কোন বিকল্প নেই, কারণ আমেরিকান সাম্রাজ্যবাদীরা ইউরোপিয়ানদেরই উত্তরসূরী। এর বাইরে আমেরিকানদের আলাদা কোন ইতিহাস, ঐতিহ্য বা জাতিসত্ত্বার অস্তিত্ব নেই! এ প্রসঙ্গে আমেরিকার দ্বিতীয় প্রেসিডেন্ট জন এ্যাডামস জ্ঞানতই হোক আর অবচেতন মনেই হোক, একটা চরম সত্যকেই তিনি সবার সামনে মেলে ধরে ইতিহাসে স্বরণীয় হয়ে আছেন। যেমন-তিনি বলেছিলেন, 'আমেরিকার স্বাধীনতা যুদ্ধের কারণ জানতে হলে আমেরিকার পেছনের দুই শত বছরের ইতিহাস জানতে হবে'। আর আমেরিকার পেছনের দুই শত বছরের ইতিহাস হ’লো, তৎকালীন ইউরোপের বিভিন্ন মনিষী ও ধর্ম যাজকদের ভাষায় 'ডাকাতি আর খুনের ইতিহাস'!

১৪৯২ সালের পূর্বে পৃথিবীতে বর্তমান আমেরিকার কোন অস্তিত্বই ছিল না। ইতালীর জেনোয়ায় জন্ম গ্রহণ কারী ক্রিষ্টোফার কলম্বাস (১৪৫১-১৫০৬) নামক একজন ভৌগোলিক আবিস্কারক সর্ব প্রথম ১৪৯২ সালের ৩রা আগষ্ট তৎকালীন স্পেনের যুক্ত অধিপতি রাজা ফার্নিন্যান্ড ও রাণী ইসাবেলার সহায়তায় 'নিনা', 'মিন্টা' ও 'সান্টামারিয়া' নামক তিন খানি জাহাজ নিয়ে ভৌগোলিক আবিস্কারের উদ্দেশ্যে বেড়িয়ে পড়েন এবং সে যাত্রায় প্রথমে তিনি পশ্চিম ভারতীয় দ্বীপপুঞ্জ ও পরে আমেরিকা আবিস্কার করেন। পরবর্তী কালে 'আমেরিগো ভেসপুচি' (১৪৫১-১৫১২) নামক অন্য একজন ইতালীয়ান নেভিগেটর ওই একই ভূখন্ড ভ্রমন করেন এবং অরও পরে তারই নামানুসারে আমেরিকার নাম করণ করা হয়।

ইতিহাসের বাঁকে বাঁকে ইউরোপের ভৌগোলিক আবিস্কারকগণ রাষ্ট্রীয় পৃষ্ঠপোষকতায় নতুন নতুন ভূখন্ড আবিস্কারের নেশায় অনেক সাগর মহাসাগর পাড়ি দিয়ে ইতিহাসের পাতায় পাতায় 'হিরো' হয়ে আছেন, কিন্তু তারা ছিলেন মূলতঃ জলদশ্যু, ভূমিদশ্যু এবং পরে খুনি ও লুটেরা! আমেরিকা আবিস্কারের পরে ইউরোপিয়ানরা চেয়েছিলেন সেখানকার সোনা আত্মসাৎ করতে! সে লক্ষ্যেই তারা সোনার খনিতে কাজ করানোর উদ্দেশ্যে প্রয়োজনীয় সংখ্যক আদিবাসীকে বাঁচিয়ে রেখে বাকী সবাইকে নৃশংস ভাবে হত্যা করে ও সে দেশের ভূমি ও সম্পদ কুক্ষিগত করতে থাকে। আদিবাসীদের স্বার্থ সংরক্ষণ এবং ইউরোপিয়ানদের অত্যাচারের হাত থেকে তাদের রক্ষার লক্ষ্যে 'বার্তোলিমি ডি লা কাসাস' নামক একজন স্প্যানিশ যাজক  তখন স্পেনের রাজধানী 'ভ্যালোডোলিড' এর আদালতে স্প্যানিশদের বিরুদ্ধে মামলা করে বিতর্কের ঝড় তোলেন, সেই সাথে আদিবাসীদের বিরুদ্ধে পরিচালিত স্প্যানিশদের নৃশংসতার একটা সংক্ষিপ্ত ইতিহাসও রচনা করেন।

ইউরোপিয়ানরা যে জাতি হিসাবে বর্বর ছিল, ৪৭৬ সালে জার্মান কর্তৃক রোমান সাম্রাজ্য দখলের মাধ্যমে সেই সত্যটাই ইতিহাসে প্রতিষ্ঠিত হয়। পরবর্তীকালে ইউরোপের বিভিন্ন দেশ, বিশেষ করে ব্রিটিশরা তদীয় দেশের অপরাধীদের মৃত্যু দন্ড (সাদা চামড়ার মানুষের সংখ্যাগরিষ্ঠতা কমে যাওয়ার ভয়ে) না দিয়ে আমেরিকা, অষ্ট্রেলিয়া, নিউজিল্যান্ড প্রভৃতি দেশে নির্বাসনে পাঠাতে থাকে। কারণ তারা কেবলমাত্র সাদা চামড়ার মানুষকেই মানুষ জাতির প্রতিনিধিত্বকারী প্রজাতি বলে মনে করত! নির্বাসিতদের দেখভাল করার জন্য সরকারী জনবলের সাথে সাথে কর্মসংস্থানের আশায় অনেক সাধারণ মানুষও পরে সেখানে অভিবাসিত হতে থাকে। এতে করে তাদের কয়েকটা বাড়তি উদ্দেশ্যও পূরণ হয়। যেমন, তাদের মূল ভূখন্ডের আইন-শৃঙ্খলা জনিত পরিস্থিতির উন্নতি হয়, বাড়তি ভূমি করায়ত্ব হয় এবং সে সব দেশের সম্পদ মূল ভূখন্ডে স্থানান্তর করা অর্থাৎ লুন্ঠণ করা সহজ হয়। এভাবেই ব্রিটিশরা বিশ্বের অনেক দেশেই তাদের উপনিবেশ গড়ে তোলে।

ওই সমস্ত দেশের বর্তমান অধিবাসীগণ যে তৎকালীন ইউরোপের সাজাপ্রাপ্ত আপরাধীদেরই বংশধর তার স্বপক্ষে একটি মজার উদাহরণ এই মুহুর্তে আমার মনে পড়ছে, যেমন-অষ্ট্রেলিয়ার একজন সাবেক নব নির্বাচিত প্রধানমন্ত্রী 'কেভিন রাড' কে সাংবাদিকগণ প্রশ্ন করেছিলেন, 'জনশ্রুতি আছে, আপনার নানীর পরিবার চুরির দায়ে ইংল্যান্ড থেকে দন্ডপ্রাপ্ত হয়ে অষ্ট্রেলিয়ায় নির্বাসিত হয়েছিলেন, এ সম্পর্কে আপনার বক্তব্য কী?' জবাবে খুব স্বাভাবিক ভাবেই তিনি বলেছিলেন, 'এ ব্যাপারে আমি লজ্জিত নই, কারণ অষ্ট্রেলিয়ানদের ইতিহাস এর বাইরে নয়!' এই একই উদাহরণ অন্যান্য দেশের বেলায়ও প্রযোজ্য।

কর্ম সংস্থানের উদ্দেশ্যে যারা ইউরোপ থেকে আমেরিকায় অভিবাসিত এবং দন্ডপ্রাপ্ত হয়ে যারা তথায় নির্বাসিত হয়েছিলেন, তারা কিন্তু উক্ত ব্রিটিশ উপনিবেশে খুব একটা শান্তিতে ছিলেন না। কারণ ব্রিটিশ সরকার আমেরিকাকে একটি দন্ডপ্রাপ্ত অপরাধীদের নিয়ন্ত্রিত অভয়ারণ্য বা নিয়ন্ত্রিত উন্মুক্ত কারাগার ছাড়া অন্য কিছু ভাবতো না। ফলে সেই সব ইউরোপীয় বংশদ্ভূত আমেরিকানদের বংশধরগণ ব্রিটিশ সরকারের অত্যাচারে অতিষ্ট হয়ে একসময় ঐক্যবদ্ধ হতে বাধ্য হয় এবং ব্রিটিশ সরকারের বিরুদ্ধে ১৭৭৫ সালে সপ্তবর্ষ ব্যাপি এক রক্তক্ষয়ী সশস্ত্র সংগ্রামের সুত্রপাত ঘটায়। তারই এক পর্যায়ে, ১৭৭৬ সালের ৪ঠা জুলাই তদীয় কংগ্রেসে টমাস জেফারসন স্বাধীনতার ঘোষনা দেন, যার সমাপ্তি হয়েছিল ১৭৮৩ সালে। এ ভাবেই পৃথিবীতে স্বাধীন আমেরিকার জন্ম হয়, যাদের পূর্ব পুরুষরা আমেরিকার ভূমিপুত্রই ছিল না, ছিল তৎকালীন বর্বর ইউরোপিয়ানদের উচ্ছিষ্ট মাত্র!


এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

Vikings, Prison, Imperialism, Spain, Europe, states, United, America