সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

RanaPlaza.jpg

রানা প্লাজা শুকিয়েছে রক্তের দাগ কিন্তু শুকায়নি চোখের পানি

২৪ এপ্রিল ছিল রানা প্লাজা ধ্বসের দুই বছর পূর্তি। এখনও থামেনি স্বজনদের কান্না। কমেনি নিখোঁজ শ্রমিকদের ছবি হাতে স্বজনদের ভিড়। আশানুরূপ হয়নি মামলার অগ্রগতি। ক্ষতিগ্রস্তদের অনেকেই পাননি ক্ষতিপূরণ। এরকম নানা প্রাপ্তি-অপ্রাপ্তি ও অভিযোগের মধ্য দিয়েই পালিত হয়ে গেল শোকবিহ্বল এ দিনটি।

শুকিয়েছে রক্তের দাগ কিন্তু শুকায়নি চোখের পানি। সে দিন আমারা সবাই দেখেছি পৃথিবীর ইতিহাসে বিবর্জিত এক কালো অধ্যায়। একই সঙ্গে দেখেছি হাজারও লাশের স্তুপ। এ দিন স্ত্রী হারিয়েছেন স্বামীকে, স্বামী হারিয়েছেন স্ত্রীকে, ভাইকে ফেরত না পাওয়ার বেদনায় কাতর বোন,  বোনের লাশের প্রতীক্ষায় ভাই, সন্তানের মৃত্যু শোকে ব্যাকুল মা-বাবা। ছোট্ট অবুঝ শিশুর কণ্ঠে ‘মা-বাবার’ ডাক।

বলছি, ২৪ এপ্রিল ২০১৩ সালে সাভার বাজার বাস স্ট্যান্ডে ঘটে যাওয়া ইতিহাসের ভয়াবহ তম ট্র্যাজেডি রানা প্লাজা ধসের ঘটনার কথা। যার মধ্য দিয়ে ছিন্ন ভিন্ন হয়ে গেছে এক একটি পরিবার। ভয়াবহ রানা প্লাজা ভবন ধসের দুই বৎসর পূর্তি হছে আজ।

গত শুক্রবার দুই বৎসর পূর্তি উপলক্ষে সকাল থেকে বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠন এবং আহত শ্রমিক ও নিহত নিখোঁজ শ্রমিকদের স্বজনেরা নিহত শ্রমিকদের স্মরণে রানা প্লাজার সামনে নির্মিত স্মৃতি স্তম্ভে ফুল দিয়ে শ্রদ্ধা নিবেদন করেছেন।

এসময় নিখোঁজ নিহত শ্রমিকের স্বজনদের কান্নায় বাতাস ভাড়ি হয়ে ওঠে। সকাল থেকে শত শত আহত নিহত নিখোঁজ শ্রমিকদের স্বজনেরা রানা প্লাজার সামনে এসে জোড় হতে থাকে। এসময় রানা প্লাজার ধসের সঙ্গে জড়িত সকল আসামিদের ফাঁসির দাবি করে বিক্ষোভ মিছিল করেছে বিভিন্ন শ্রমিক সংঘঠন।

এদিন দুই বৎসর পূর্তি উপলক্ষে বিভিন্ন হাসপাতাল রানা প্লাজার সামনে আহত শ্রমিক ও তাদের স্বজনদের ফ্রি চিকিৎসা সেবা দেন। প্রশাসনের পক্ষ থেকে যে কোনো ধরনের অপ্রীতিকর ঘটনা এড়াতে রানা প্লাজার সামনে অতিরিক্ত পুলিশ মোতায়েন করা হয়।

গত দু’বছরে আহত শ্রমিকদের কেউ-কেউ আবার ঘুরে দাঁড়ানোর চেষ্টা করেছেন। শোক ভুলে শুরু করেছেন নতুন জীবন। আবার দুঃসহ সেই বেদনা কে ভুলতে পারেননি অনেকে। অশ্রু সিক্ত চোখে তার হৃদয়ে স্বজনহারা বেদনার ভার নিয়ে বয়ে বেড়াচ্ছেন তারা।

সরকারের পক্ষ থেকে নিখোঁজ ও আহত শ্রমিকদের পূর্ণাঙ্গ তালিকা এখনও প্রকাশ করা হয়নি। দেয়া হয়নি শ্রমিকদের ন্যায্য ক্ষতি পূরণও যার দাবি জানাচ্ছে শ্রমিক ফেডারেশনের কয়েকটি সংগঠন। কিন্তু তাদের ক্ষতি পূরণের টাকা সঠিক ভাবে বন্টন হচ্ছে না।

নিহত ও আহত শ্রমিকদের কথা সবাই বলছে, সাহায্য দিচ্ছে। কিন্তু নিখোঁজ শ্রমিকদের পরিবারের সহায়তায় এখনও কেউ এগিয়ে আসেনি, কেউ তাদের খোঁজও নেয় না বলে অভিযোগ করেন নিখোঁজদের স্বজনেরা।

এদিকে শ্রমিক নেতাদের দাবি, রানা প্লাজা ট্রাজেডি মামলায় প্রায় ৬ মাস আগে তদন্ত শেষ হলেও সরকারি মঞ্জুরি আদেশের জন্য আদালতে চার্জশিট দাখিল করতে পারছেন না পুলিশের অপরাধ তদন্ত বিভাগ (সিআইডি)।

রানা প্লাজা ধসের ২ বছর এখনো বিচারের ফাইলটি যেন বস্তা বন্দি হয়ে কাঁদছে।

উল্লেখ্য, ২০১৩ সালের ২৪ এপ্রিল সাভার বাজার বাসস্ট্যান্ডে ইতিহাসের ভয়াবহ তম রানা প্লাজা ধসের ঘটনা ঘটে। এ ঘটনায় রানা প্লাজার ধ্বংসস্তুপ থেকে ২ হাজার ৪৩৮ জনকে জীবিত এবং ১ হাজার ১১৭ জনকে মৃত উদ্ধার করা হয়।

পরে হাসপাতালে চিকিৎসাধীন অবস্থায় আরও ১৯ জন মারা যান। সব মিলিয়ে মৃতের সংখ্যা দাঁড়ায় ১ হাজার ১৩৬ জনে।  ১ হাজার ৫শ’ ২৪ জন আহত হন।  ২৯১ জনের লাশ অশনাক্তকৃত অবস্থায় জুরাইন কবর স্থানে দাফন করা হয়েছে।

নিহতদের স্মরণে  রানা প্লাজার ধ্বংসাবশেষের সামনে এবং জুরাইন কবরস্থানে  জড়ো হয়েছিলেন নিহত শ্রমিকদের স্বজন, সহকর্মী, বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনসহ নানা শ্রেণী-পেশার মানুষ। স্বজনহারাদের কান্না, আবেগ আর আহাজারিতে ভারি হয়ে উঠেছিল সেখানকার পরিবেশ ।

২০১৩ সালে ২৪ এপ্রিল সাভারের রানা প্লাজা দুর্ঘটনা কেবল বাংলাদেশকেই নয়, স্তম্ভিত করেছিল গোটা বিশ্বকে। ওই সময় শ্রমিকদের কাজের পরিবেশের নিরাপত্তা নিয়ে সমালোচনার ঝড় ওঠে বিশ্বব্যাপী। এর জের ধরে নিরাপত্তার অভাবের কারণ দেখিয়ে যুক্তরাষ্ট্রের বাজারে অগ্রাধিকারমূলক বাণিজ্য সুবিধা (জিএসপি) স্থগিত করে মার্কিন সরকার।

পরবর্তী সময়ে জিএসপি সুবিধা ফিরে পেতে শ্রম পরিবেশ উন্নয়নে ১৬টি শর্ত দেয় যুক্তরাষ্ট্র। এসব শর্ত পূরণ করতে পারলে জিএসপি সুবিধা পুনর্বহালের বিষয়টি বিবেচনা করবে বলে আশ্বাস দেয় মার্কিন সরকার। এরপর শুরু হয় রপ্তানিকেন্দ্রিক তৈরি পোশাকশিল্পে কারখানার কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তাব্যবস্থা জোরদার বিষয়ে ব্যাপক তোড়জোড়।  নেওয়া হয় নানান উদ্যোগ।

তবে এরপরও বিভিন্ন শ্রমিক সংগঠনগুলোর অভিযোগ রয়েছে অনেক। তারা বলছেন, রানা প্লাজা ধ্বসের দুই বছর পেরিয়ে গেলেও ক্ষতিগ্রস্তদের অনেকেই এখনও ক্ষতিপূরণ পাননি। যারা পেয়েছেন তাও অপর্যাপ্ত। এছাড়া আহত, পঙ্গু ও চাকরি হারানো অনেক শ্রমিক দিনানিপাত করছেন বহুকষ্টে।

এছাড়াও অভিযোগ ওঠেছে মামলার বিষয়ে। সাভারে রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় করা মূল দুটি মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়নি।  রানা প্লাজা ধসের ঘটনায় মোট পাঁচটি মামলা হয়েছিল। এর মধ্যে ভবন থেকে অস্ত্র উদ্ধারের ঘটনায় করা দুটি মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়েছে। কিন্তু রানা প্লাজা ধসের কারণে হতাহতের ঘটনাকে অবহেলাজনিত মৃত্যু হিসেবে চিহ্নিত করে করা মামলা এবং রাজধানী উন্নয়ন কর্তৃপক্ষ (রাজউক) ইমারত নির্মাণ আইনে সাভার থানায় করা মামলায় অভিযোগপত্র দেওয়া হয়নি।

ভবন ধ্বসের পর বিচ্ছিন্নভাবে বেশ কিছু কাজ হলেও এসবের মধ্যে সমন্বয় ও স্বচ্ছতার অভাব রয়েছে বলে মনে করেন অনেকেই। তাই ঐক্যবদ্ধ হয়ে আমাদের কাজ করতে হবে। ক্ষতিগ্রস্ত শ্রমিকদের যথাযথ ক্ষতিপূরণ নিশ্চিত করতে হবে।

যদিও সর্বসত্য রানা প্লাজা ধ্বসের পর গার্মেন্ট শিল্পে অবকাঠামোগত কমপ্লায়েন্সের ব্যাপক উন্নতি হয়েছে।

এরপরও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের উচিত হবে এখনই দেশের কারখানাগুলোর কর্মপরিবেশ ও নিরাপত্তা ব্যবস্থার দিকে আরোও নজর দেওয়া।

একই সঙ্গে রানা প্লাজা ধসের ঘটনার বিচার প্রক্রিয়ার দ্রুত নিষ্পত্তি করা প্রয়োজন।  যা এখন লাখো শ্রমিকের দাবি।

-
লেখক: ফুয়াদ সৌরভ
৩০ এপ্রিল ২০১৫
এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

Rana-plaza, disaster, life, Garments, Danger, 2013, Bangladesh, Savar