সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

dcc-election-2015.jpg

সিটি নির্বাচন শেষ পর্যন্ত একতরফাই রয়ে গেলো সিটি নির্বাচন

যা আশঙ্কা করা হয়েছিল তাই হলো। অস্বাভাবিক পরিস্থিতিতে আয়োজন করা তিন সিটি করপোরেশন নির্বাচন শেষ পর্যন্ত একতরফাই রয়ে গেলো। কারণ ক্ষমতাসীন দল সমর্থিতদের বিরুদ্ধে ‘কেন্দ্র দখল ও কারচুপির’ অভিযোগ এনে বেলা ১২টার পরেই ভোটের মাঠ ছেড়ে দিলো বিএনপি। 

প্রথমে চট্টগ্রাম সিটি করপোরেশন নির্বাচন বর্জন করলেন বিএনপি সমর্থিত মেয়র প্রার্থী মনজুর আলম (মনজুর অবশ্য রাজনীতিও বর্জনের ঘোষণা দিয়েছেন!)। এর কিছুক্ষণ পরেই ঢাকার দুই মেয়র প্রার্থী মির্জা আব্বাস ও তাবিথ আউয়াল। মনজুরের পক্ষে বিএনপি নেতা আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী এবং আব্বাস ও তাবিথের পক্ষে বিএনপি স্থায়ী কমিটির সদস্য মওদুদ আহমদ নির্বাচন বর্জনের ঘোষণা দিলেন। তিন মাসের টানা অবরোধ হরতালের অনানুষ্ঠানিক বিরতি দিয়ে বিএনপি যখন সিটি নির্বাচনে এলো, তখন থেকেই এমনটি আশঙ্কা করা হচ্ছিলো।

বিএনপি চেয়ারপাসরন বেগম খালেদা জিয়ার আহ্বানে ঢাকা ও চট্টগ্রামের মানুষের ‘নীরব ভোট বিপ্লব’ ঘটিয়ে সরকারের কথিত ‘অত্যাচারের’ বদলা নেবার সুযোগ আর হলো না। ভোটররা সুযোগ পেলেন না প্রধানমন্ত্রী শেখ হাসিনার আহ্বানে বিএনপি-জামায়াত জোটের ৯২ দিনের অবরোধ-হরতালের ক্ষতি আর পেট্রোল বোমা-সন্ত্রাসের প্রতিশোধ নেবার।

মেয়র প্রার্থীদের পক্ষে ভোট চাওয়ার পথে বিএনপি-জামায়াত জোট নেত্রী বেগম জিয়ার গাড়িবহরে হামলা, বিচারিক ক্ষমতা দিয়ে রাস্তায়-ভোটকেন্দ্রে সেনাবাহিনী মোতায়েন না করা এবং নির্বাচনে লেভেল প্লেইং ফিল্ড নিশ্চিত না করাসহ নানা অভিযোগ ছিল বিরোধীদল সমর্থিত ও সব দলের ‘বিদ্রোহী’ প্রার্থীদের তরফ থেকে। সরকারের বিরুদ্ধে অভিযোগ ছিল আওয়ামী লীগ সমর্থিত প্রার্থীদের ‘যে কোন মূল্যে’ জিতিয়ে আনার ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের’ও। তারপরেও মঙ্গলবার সকাল ৮টা থেকে শান্তিপূর্ণভাবেই ভোটগ্রহণ শুরু হয়েছিল। কিন্তু জাতি বুঝতে পারলো না বেলা ১২টার মধ্যে এমন কী ঘটলো যে বিএনপিকে ভোটের মাঠ ছেড়ে দিতে হলো? জাতি বুঝলো না এটা সরকারকে আবারো বেকায়দায় ফেলার সেই চিরাচরিত চক্রান্ত কি না।

যদিও আমাদের দেশে ভোটের গণতন্ত্রও প্রাতিষ্ঠানিক রূপ পায়নি। এখনো নির্বাচন প্রক্রিয়া মেনে নেয়ার মানসিকতা তৈরি হয়নি। নেই রাজনীতিবিদ বা রাজনৈতিক দলগুলোর নির্বাচনে হার মেনে নেওয়ার মানসিকতা। এই না থাকাটাই গণতন্ত্রের বড় সংকট। দেশের বড় দুই রাজনৈতিক দল আওয়ামী লীগ ও বিএনপিতে নেই গণতান্ত্রিক সংস্কৃতি। নির্বাচনে যে হার-জিত আছে, তা দলগুলো মানতে নারাজ। রাজনীতিবিদরা নির্বাচন করতে রাজি, কিন্তু হারতে বা পরাজয় মানতে চান না। অতীতের নির্বাচনগুলোয় যারাই হেরেছে, তারা কখনোই নির্বাচন মেনে নেয়নি। তাহলে এবারও বিরোধী দল সেরকম আভাস পেয়েছিল কি-না তা এখনো জানা যায়নি।

সরকার ও নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে ‘ইলেকশন ইঞ্জিনিয়ারিংয়ের’ অভিযোগ নতুন নয়। বিএনপি শুরু থেকেই ‘প্রহসনের নির্বাচন’ করার এবং ‘ক্ষমতাসীনদের জন্য নির্বাচনের ফল হাইজ্যাকের নীল নকশা’ প্রণয়নের অভিযোগ তুলেছিল ইসি’র বিরুদ্ধে। এই আগাম অভিযোগ থেকে এটা মনে হওয়াটা দোষের নয় যে ‘শেখ হাসিনার সরকারের কাঁধে সুষ্ঠু নির্বাচন অনুষ্ঠানে ব্যর্থতার’ দায় চাপিয়ে নির্বাচন থেকে সরে যাবার ’নীল নকশা’টা বিএনপি আগে থেকেই তৈরি করে রেখেছিল!

ভোটের ফল হাইজ্যাক করবে কে? একা একা চললে হাইজ্যাকের ভয় থাকে। সবাই মিলে চললে হাইজ্যাকাররা ভয় পায়। কিন্তু আমাদের দেশে কেন্দ্রে কেন্দ্রে পাহারা বসিয়েও বিরোধী দল কারচুপি প্রতিরোধ করতে পারে না। অভিযোগ আনে ‘ভোট ডাকাতি’র।    

আসলে নির্বাচনে হার মেনে নেওয়ার মানসিক প্রস্তুতি নেই যেখানে সেখানে উৎসবমুখর, সুষ্ঠু অবাধ ও নিরপেক্ষ নির্বাচন আশা করাটাও দূরাশা। অতীতের রেকর্ড তাই বলে। বিচারপতি হাবিবুর রহমানের তত্ত্বাবধায়ক সরকারের অধীনের নির্বাচন ছাড়া অতীতে কোন নির্বাচনই সুষ্ঠু অবাধ নিরপেক্ষ এবং সবার কাছে গ্রহণযোগ্য হয়েছে বলে আমাদের জানা নেই। সব নির্বাচনেই কারচুপি ও পক্ষপাতিত্বের অভিযোগ ছিল। সেটা সরকারের বিরুদ্ধে হোক বা নির্বাচন কমিশনের বিরুদ্ধে হোক।

তবে এটাও ঠিক যে, আমাদের দেশের নির্বাচন কমিশনকে কখনোই স্বাধীন ও শক্তিশালী ভূমিকায় দেখা যায়নি। কারণ সাংবিধানিক ক্ষমতা প্রয়োগের যোগ্যতা আমাদের নির্বাচন কমিশনাররা ধারণ করেন না। এর প্রমাণ ৫ জানুয়ারির একতরফা নির্বাচন এবং পরবর্তীতে উপজেলা ও পৌরসভা নির্বাচনের শেষ ধাপ। এবারের সিটি নির্বাচনে যা হলো, তার নেতিবাচক প্রভাব পড়বে জাতীয় রাজনীতিতে। বিএনপি তথা ২০ দলীয় জোট আবারো গণতান্ত্রিক ধারাকে সন্ত্রাসের পথে নিয়ে যাওয়ার ‘নীল নকশা’ বাস্তবায়ন করতে পারে।

৯২ দিনের ‘অফিসবাস’ ছেড়ে বেগম জিয়ার ঘরে ফেরা এবং সিটি নির্বাচনে অংশ নেয়াটা রাজনীতিতে যে সুবাতাস নিয়ে এসেছিল, সেটা ঘূর্ণিঝড়ে রূপ নিতে যাচ্ছে বলেই আমাদের মনে হচ্ছে। এই পূর্বাভাস পেয়ে দুর্যোগ মোকাবেলার সব রকমের প্রস্তুতি সরকারকে নিতে হবে। আর বিরোধী দলকেও আন্দোলনের নামে দেশবাসীকে জিম্মি করার এবং পেট্রোল বোমার আগুনে মানুষ পোড়ানোর নষ্ট রাজনীতি বর্জন করতে হবে। শেষ পর্যন্ত সিটি নির্বাচনের ফলাফল যা-ই হোক, যদিও এ রায় সরকার বদলের ম্যান্ডেট নয়, তবুও গণতন্ত্রের স্বার্থে এ নির্বাচনের পরপরই জাতীয় নির্বাচন নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সরকারকে অবশ্যই নির্বাচন পদ্ধতি, নির্বাচনকালীন সরকার পদ্ধতিসহ গুরুত্বপূর্ণ বিষয়গুলো নিয়ে রাজনৈতিক দলগুলোর সাথে সংলাপে বসতে হবে। আর সেই সংলাপই বলে দেবে, সরকার বদলের নির্বাচন ২০১৯ সালে হবে, না তারও আগে।


এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

Bangladesh, league, Awami, BNP, politics, 2015, corporation, city, dcc, election