সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

employment-education.jpg

চাই সমৃদ্ধি বেকারত্ব নিরসনে চাই বাস্তবভিত্তিক ও যুগোপযোগী শিক্ষাব্যবস্থা

শিক্ষাই একটি জাতির উন্নয়নের মূল চাবিকাঠি। যে জাতি যত বেশি শিক্ষিত সে জাতি তত বেশি উন্নত। আর একটি দেশের জাতীয় উন্নয়নের প্রধান চালিকাশক্তি হলো সে দেশের শিক্ষিত যুবসমাজ। দেশের যুবসমাজকে সুশিক্ষায় শিক্ষিত করে উপযুক্ত কর্মসংস্থানের ব্যবস্থা করার মাধ্যমে তাঁদের মেধা ও শ্রমকে পরিপূর্ণরূপে রাষ্ট্রের উন্নয়নে নিয়োজিত করা রাষ্ট্রের অন্যতম প্রধান দায়িত্ব । 

দেশের যুবসমাজকে প্রয়োজনীয় শিক্ষা প্রদান করে যদি যথার্থ কর্মে নিয়োজিত করা যায়, তবে সে দেশের উন্নয়ন কেউ ঠেকাতে
পারবে না। কিন্তু অত্যন্ত দুর্ভাগ্যজনক হলেও সত্যি যে, আমাদের জাতীয় উন্নয়নের সবচেয়ে বড় প্রতিবন্ধকতা এখন বিরাট সংখ্যক উচ্চশিক্ষিত যুবসমাজ। 

আমাদের যুবসমাজকে আমরা রাষ্ট্রীয় সম্পদ হিসেবে গড়ে তোলার পরিবর্তে বরং দেশের বোঝায় পরিনত করছি। তাঁদের মেধা ও শ্রমকে রাষ্ট্রের উন্নয়নে নিয়োজিত করতে সম্পুর্ণরূপে ব্যর্থ হচ্ছি। বর্তমানে বাংলাদেশের সবচেয়ে বড় সমস্যা হচ্ছে দরিদ্রতা ও বেকারত্বের সমস্যা। আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা আইএলও’র পরিসংখ্যান অনুযায়ী, বর্তমানে বাংলাদেশে মোট জনসংখ্যার প্রায় ৪০ শতাংশ বেকার। 

বেকারত্বের সংজ্ঞায় আমরা বলতে পারি, পরিপূর্ণভাবে সক্ষম, কর্মের প্রতি আগ্রহশীল একজন মানুষ কোনো কাজ না করে দিনের পর দিন অলস সময় কাটিয়ে যাওয়া — এটাই হলো বেকারত্ব। মানুষ কাজ করতে চায়, তার কাজ করার ক্ষমতা আছে, তবু সে উপযুক্ত কাজ পায় না।

বাংলাদেশ পরিসংখ্যান ব্যুরো, আন্তর্জাতিক শ্রম সংস্থা (আইএলও) ও কমনওয়েলথসহ একাধিক সংস্থার পরিসংখ্যান অনুযায়ী গত এক দশকে বাংলাদেশে বেকারত্ব বেড়েছে ১ দশমিক ৬ শতাংশ, কর্মসংস্থান প্রবৃদ্ধির হার কমেছে ২ শতাংশ। এই হার বজায় থাকলে ২০১৫ সালে দেশে মোট বেকারের সংখ্যা দাঁড়াবে প্রায় ৬ কোটিতে । 

শিক্ষিত জনসাধারণের মধ্যে এই হার সবচেয়ে বেশি। পরিসংখ্যান ব্যুরোর সূত্রমতে, বর্তমানে দেশে শিক্ষিত বেকারের সংখ্যা প্রায় দেড় কোটি। পরিসংখ্যান অনুযায়ী প্রতি বছর প্রায় এক লাখ শিক্ষিত বেকার শ্রমবাজারে আসছে। এদের অধিকাংশই বিভিন্ন বিশ্ববিদ্যালয় হতে শিক্ষা সম্পন্ন করে থাকে। এদের ৪৫ শতাংশ চাকুরী পেলেও প্রায় ৫৫ শতাংশ বেকার থাকছে কিংবা যোগ্যতা অনুযায়ী চাকুরি পাচ্ছে না। 

আর এ বেকারত্বের মূলে কাজ করছে বাস্তবতার সাথে অসঙ্গতিপূর্ণ ও অপরিকল্পিত শিক্ষাব্যবস্থা। স্বাধীনতার তেতাল্লিশ বছর পেরিয়ে গেলেও আমরা একটি যুগোপযোগী ও বাস্তবসম্মত শিক্ষাব্যবস্থা জাতিকে উপহার দিতে ব্যর্থ হয়েছি। দেশের বিশ্ববিদ্যালয়গুলোকে পরিনত করেছি বেকার তৈরির কারখানায়। এসব প্রতিষ্ঠান প্রতি বছর সৃষ্টি করছে লক্ষ লক্ষ উচ্চশিক্ষিত বেকার। প্রচলিত শিক্ষাব্যবস্থায় দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ থেকে সর্বোচ্চ ডিগ্রি অর্জনের পরও তাঁরা পরিবার, সমাজ কিংবা রাষ্ট্রের উন্নয়নে কোন ভূমিকা রাখতে  পারছে না। উপরন্তু দেশের বোঝা হয়ে দিনাতিপাত করছে। ফলে দিন দিন প্রকটাকার ধারন করছে শিক্ষিত বেকারত্ব। 

আমাদের শিক্ষাক্রমের সাথে চাকুরির বাজারের চাহিদার কোন সঙ্গতি নেই। গতানুগতিক শিক্ষা আমাদের বাস্তব জীবনে কোন কাজে আসছে না। এ শিক্ষা না পারছে দেশে সুশিক্ষিত ও জ্ঞানীলোক তৈরি করতে, আর না পারছে দক্ষ জনশক্তি গড়ে তুলতে। মূলত বিশ্ববিদ্যালয় হতে প্রাপ্ত শিক্ষা দেশের চাকুরীর বাজারের চাহিদা পূরণে ব্যর্থ হচ্ছে। যেসব ক্ষেত্রে অধিক সংখ্যক প্রশিক্ষিত ও দক্ষ জনবল প্রয়োজন সেসব ক্ষেত্রে অপেক্ষাকৃত কম শিক্ষার্থী ভর্তি করা হচ্ছে। অন্যদিকে যেসব বিষয়ে অধিক সংখ্যক শিক্ষার্থী ভর্তি করা হচ্ছে চাকুরীর বাজারে সেসব বিষয়ের চাহিদা একেবারেই অল্প। 

আমাদের দেশে পাঠ্যক্রম অনুযায়ী কর্মক্ষেত্র নাই বললেই চলে। ফলে দেশের সর্বোচ্চ বিদ্যাপীঠ থেকে স্নাতোকোত্তর ডিগ্রি লাভের পরও বাধ্য হয়েই শিক্ষার্থীদের চাকুরীর বাজারের চাহিদাসম্পন্ন বিশেষায়িত প্রশিক্ষণ গ্রহণ করতে হচ্ছে। এতে একদিকে যেমন প্রচুর আর্থিক ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে, অন্যদিকে অনেক সময়ও নষ্ট হচ্ছে। তাছাড়া লক্ষ্যহীন উচ্চশিক্ষা আমাদের শিক্ষিত যুবসমাজকে যে কাজে নিয়োজিত করছে তা মোটেও পঠিত বিষয় সংশ্লিষ্ট নয়। কোন একটি চাকুরীর বিজ্ঞপ্তি প্রকাশিত হলে দেখা যায়, সকল বিভাগের শিক্ষার্থী হুমড়ি খেয়ে পড়ে। এর প্রধান কারন আমাদের পরিকল্পনাহীন শিক্ষাক্রম।  

আমাদের নীতিনির্ধারকদের উচিত, গতানুগতিক পাঠ্যক্রম পরিহার করে কর্মক্ষেত্রের চাহিদা বিবেচনায় রেখে কোন খাতে কেমন জনবল প্রয়োজন সে অনুযায়ী দক্ষ ও প্রশিক্ষিত জনশক্তি গড়ে তোলা। আমাদের প্রধান গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্রগুলো হলো তথ্যপ্রযুক্তি, তৈরিপোষাক শিল্প, চামড়া শিল্প, কৃষিজাত পণ্য প্রক্রিয়াজাতকরণ, জাহাজ নির্মাণ, পর্যটন শিল্প, ব্যাংক-বীমা, টেলিকম খাত। এছাড়াও দেশে এখনো পর্যন্ত পর্যাপ্ত পরিমাণ দক্ষ ডাক্তার, ইঞ্জিনিয়ার, ডেন্টিস্ট, ফার্মাসিস্ট, আর্কিটেক্ট, মেরিন ও এরোনটিক্যাল ইঞ্জিনিয়ারের যথেষ্ট চাহিদা রয়েছে। চাহিদা রয়েছে দক্ষ ও প্রশিক্ষিত শিল্প-উদ্যোক্তার। সামরিক বাহিনীতেও প্রয়োজন সুশিক্ষিত ও দক্ষ দেশপ্রেমিক নাগরিক।  

দেশের বাইরে আন্তর্জাতিক শ্রমবাজারেও রয়েছে প্রশিক্ষিত ও দক্ষ জনশক্তির প্রচুর চাহিদা। কিন্তু আমাদের শিক্ষিত বেকার যুবসমাজ গতানুগতিক ও সনদসর্বস্ব শিক্ষায় শিক্ষিত হলেও দেশ-বিদেশের কর্মক্ষেত্রের প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হওয়ার মত উপযুক্ত প্রশিক্ষন ও দক্ষতা তাঁদের নেই। দক্ষ ও মানসম্পন্ন মানবসম্পদ সৃষ্টি করতে আজও আমরা  আমাদের শিক্ষাক্রম সেভাবে সাজাতে পারি নাই । 

বিশ্ববিদ্যালয়গুলোতে বিভাগ অনুযায়ী আসন বন্টন ও শিক্ষার্থী ভর্তির ক্ষেত্রে তাঁদের ভবিষ্যতের বিষয়টি কর্তৃপক্ষের বিবেচনায় নেয়া একান্ত জরুরী। অপরিকল্পিতভাবে শিক্ষার্থী ভর্তি করে শিক্ষাজীবন শেষে তাঁদের বেকার হিসেবে জাতির সামনে উপস্থাপন করার কোন মানে হয় না। কাজেই বেকারত্ব নিরসনকল্পে কর্মক্ষেত্রের চাহিদার সাথে সামঞ্জস্য রেখে আমাদের শিক্ষাক্রম প্রনয়ন করা অতীব জরুরী। যেন শিক্ষাজীবন শেষে পরিবার ও দেশের বোঝা হয়ে বেকারত্বের গ্লানি বয়ে বেড়াতে না হয়। 


এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

Youth, employment, education, life, practical, unemployment, frustration