সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

ohongkar-bornomala.jpg

মাতৃভাষা ও আমাদের করণীয়

আমি গর্বিত কারণ আমি বাঙালি। আমি গর্বিত কারণ আমি বাংলায় কথা বলি। আমার অহংকার আমার ভাষা। আমার অলংকার আমার ভাষা। আমি যোগ্য উত্তরসুরি। কারণ আমি মায়ের ভাষাকে বিশ্বের দরবারে ছড়িয়ে দিতে পেরেছি।

কবি সৈয়দ শামসুল হকের ‘আমার পরিচয়’ কবিতাটি আমাকে ব্যাপক আন্দোলিত করে। আমি হারিয়ে যাই তার কবিতার গহীনে। চোখ বন্ধ করে দেখতে পাই কবিতায় বর্ণিত আলপথ, পলিমাটি, তেরশত নদী, চর্যাপদের অক্ষর, সওদাগরের ডিঙা, কৈবর্তের বিদ্রোহী গ্রাম, পালযুগ নামে চিত্রকলা, কমলার দীঘি, মহুয়ার পালা আরও কত কি।

আমি পুলকিত হই কবিতায় বলা পাহাড়পুরের বৌদ্ধবিহার, জোড়বাংলার মন্দির বেদি, বরেন্দ্রভূমের সোনা মসজিদ, আউল-বাউল মাটির দেউল দেখে। কবি বলেছেন, ‘আমি জন্মেছি বাংলায়/ আমি বাংলায় কথা বলি।/ আমি বাংলার আলপথ দিয়ে, হাজার বছর চলি।’

কবির সাথে আমিও গর্বিত। কারণ আমার ইতিহাস বীরত্বের। যেহেতু আমার আছে বারোভূঁইয়া, তিতুমীর, হাজী শরীয়ত, রবীন্দ্রনাথ, নজরুল, ক্ষুদিরাম, সূর্যসেন, জয়নুল ও অবন ঠাকুর।

তবু আমাদের দীনতার শেষ নেই। দুঃখের সাথে বলতে হয়, এখনো সর্বস্তরে বাংলা ভাষার ব্যবহার চালু হয়নি। বিজ্ঞাপন কিংবা সিনেমা-নাটকে আমার প্রিয় মাতৃভাষা অবহেলিত। পরগাছা সংস্কৃতি চর্চা আমাদের ফ্যাশনে রূপ নিয়েছে। নিজেদের ভাষা চর্চা না করে পরদেশি ভাষা চর্চায় মেতে উঠেছে অনেকেই। নিজেকে জাহির করতে চান উচ্চ শিক্ষিত হিসেবে। তারা নিশ্চয়ই উলুবনে মুক্তা ছড়াচ্ছেন। এতে কোন অহংকার নেই। বরং এক ধরনের হঠকারিতা রয়েছে।

বাংলাদেশে জন্ম নিয়ে যারা বহু ভাষাবিদ হয়েছেন- তারা প্রথমেই নিজের ভাষা সম্পর্কে যথার্থ জ্ঞান অর্জন করেছেন। মাতৃভাষাকে অস্বীকার করে বা অবহেলা করে বহু ভাষাবিদ হওয়ার মধ্যে কোন বাহাদুরি নেই। কবি আব্দুল হাকিমের ভাষায় বলতে হয়- ‘যে সবে বঙ্গেত জন্মি হিংসে বঙ্গবাণী/ সে সব কাহার জন্ম নির্ণয় ন জানি।’

কবির আক্ষেপ এখনো তাড়া করে ফেরে আমাদের। মাতৃভাষার প্রতি আমাদের অবজ্ঞা যেন দিনদিন বেড়েই যাচ্ছে। অতি স্মার্ট হওয়ার লোভে বাংলা ভাষার সাথে ইংরেজি ভাষার অহেতুক মিশ্রণ ঘটিয়ে হ-য-ব-র-ল অবস্থার সৃষ্টি করেছে। কোন কোন ক্ষেত্রে বাংলা শব্দের বিকৃত উচ্চারণ করতেও সামান্যতম দ্বিধাবোধ নেই। কোন ভাষার প্রতি আমার বিদ্বেষ নেই। থাকার কথাও না।

আমার দাবি, অন্তত মাতৃভাষাকে সম্মান করতে শিখুন। আমাদের ভাষায় বিদেশি শব্দের যথেষ্ট প্রভাব আছে সেই প্রাচীন কাল থেকেই। তাই বলে বাংলা উচ্চারণটা তো আমাদের বাংলা একাডেমি প্রণীত নিয়মেই করতে হবে- তাই না? আমি নিশ্চিত আমরা যে কলেজে পড়ি। তার ‘অধ্যক্ষ’ ও ‘অধ্যাপক’ বলার ক্ষেত্রেও উচ্চারণে ভুল করি।

আমার আহ্বান-আসুন আমরা সঠিক উচ্চারণের নিয়ম শিখে নেই। এটা খুব কঠিন কাজ নয়। তাতে আমাদের ব্যক্তিত্ব আরো বিকশিত হবে। নিজের ভাষাকে শুদ্ধ উচ্চারণে উচ্চারিত হতে দেখলে কার না ভালো লাগে?

আসুন মাতৃভাষাকে তার যথাযথ সম্মান ফিরিয়ে দেই। গর্বিত হই আমরাও। ‘শুদ্ধ উচ্চারণে উচ্চারিত হোক প্রিয় মাতৃভাষা’- এই হোক আমাদের একুশের চেতনা।


এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

Bangla, language, bornomala, pride, culture, love