সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

Sudha.jpg

জীবন যুদ্ধ সুধা চন্দ্রন হার না মানা নামকরা ক্ল্যাসিকাল নৃত্যশিল্পী

রক্তাক্ত হলেন তিনি। যন্ত্রণায় তাঁর সারা শরীর কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগলো অনুশীলনের সাথে সাথে। অনুশীলনের মেঝে তাঁর পায়ের রক্তে ভেসে যেতে লাগলো।

আমরা অনেকেই অল্পতেই হতাশ হয়ে পড়ি। আমরা নিজেরাই জানিনা যে আমাদের মাঝে কি সুপ্ত প্রতিভা রয়েছে। আমরা যারা অল্পতেই ভেঙে পড়ি তারা সুধা চন্দ্রন জীবন কাহিনী থেকে শিক্ষা নিতে পারেন। 

সুধা চন্দ্রন একজন বিখ্যাত ভারতীয় ক্ল্যাসিকাল নৃত্যশিল্পী। ভারতীয় টিভি সিরিয়ালের একজন জনপ্রিয় মুখ। অর্থনীতিতে বিশ্ববিদ্যালয়ের উচ্চ শিক্ষিতা’র খেতাব অর্জনকারিণী। সুধা চন্দ্রনের জন্ম ১৯৬৪ সালে।

অল্প বয়সেই পচাত্তরটি মঞ্চে তাঁর নৃত্য প্রদর্শন করে মানুষের নৃত্য পিপাসাকে মুগ্ধ করেছিলেন এবং ড্যান্স এ্যাকাডেমি এন্ড ভারতনাট্যম  থেকে “নৃত্য ময়ূরী” ছাড়াও তেলেগু এ্যাকাডেমি থেকে “নভজ্যোতি” পুরস্কারে সম্মানিত হয়েছিলেন।

শিল্পী’র জীবনে যে সমস্ত উত্থান-পতন থাকে তা স্বাভাবিক। তাঁকে নানা প্রতিকূলতার মধ্য দিয়েই টিকে থাকতে হয়। উন্নীত হতে হয়। সেটাই তাঁর পরিচয়কে আরো উদ্ভাসিত করে। যখনই তাঁর খ্যাতি বিচ্ছুরিত হচ্ছে তখনই একটি দুর্ঘটনা তাঁকে একেবারে অস্তিত্বের প্রান্তসীমায় এনে দাঁড় করিয়ে দেয়।

১৯৮১ সালের ৫ জুন ১৬ বছর বয়সে মা-বাবার সঙ্গে বেড়াতে গিয়ে তামিলনাড়ুতে দুর্ঘটনায় পড়লেন। ডাক্তার প্রাথমিক চিকিৎসা দিয়ে ছেড়ে দেবেন এমন সময় দেখলেন তার ডানপায়ে গ্যাংগ্রিন বাসা বেঁধেছে। বেঁচে থাকতে হলে ডান পা কেটে বাদ দিতে হবে।

একজন নৃত্যশিল্পীর জন্য পাই সব। তাই কোন নৃত্যশিল্পীর পা কেটে বাদ দেওয়া এবং নাচের দুনিয়াকে বিদায় জানানো প্রায় সমান কথা। এরপর তিনি দীর্ঘদিন ধরে দুর্দশার মধ্য দিয়ে সময় পার করেছেন। এসময় সুধা কখন নিজেকে বোঝাতে পারতেন না যে তিনি কখনও নাচতে পারবে না। 

কিন্তু সুধা চন্দ্রন থেমে থাকার পাত্রী না। পরে তিনি চিকিৎসকদের সহায়তায় প্রসথেটিক্স তথা নকল পা লাগিয়ে নেন। তিনি জানতেন এই অভিশপ্ত জীবন থেকে নিজেকে মুক্ত করে আবার মঞ্চে তাঁর শৈল্পিক পদচারনা প্রদর্শন করতে পারবেন। 

কিন্তু সেকালে কৃত্রিম পা কথাটির অর্থ একটি জীবন্ত যন্ত্রণা। সেই পা ছিল কাঠ দিয়ে তৈরি। ফলে সেই পা সংযুক্ত ক’রে হাঁটাহাঁটি করাটাই একটা বিড়ম্বনা ছিল। কিন্তু সুধা সেই পা সঙ্গুক্ত করে শুরু করলেন নৃত্য অনুশীলন। ফলে যা হবার তাই হলো।

রক্তাক্ত হলেন তিনি। যন্ত্রণায় তাঁর সারা শরীর কেঁপে কেঁপে উঠতে লাগলো অনুশীলনের সাথে সাথে। অনুশীলনের মেঝে তাঁর পায়ের রক্তে ভেসে যেতে লাগলো। কিন্তু গল্পের কোন এক নায়িকার মতো, স্বপ্নের কোন পরীর মতো নৃত্যচর্চা অবিচল রেখেছেন সুধা। যন্ত্রণা তাঁকে পরাজিত ক’রতে পারেনি।

হয়ে গেলেন ভারত বর্ষের ইতিহাসে অন্যতম বড় ড্যান্সার। শুধু তাই নয়। এই ড্যান্সার পরিচয়টাকে পুঁজি করে তিনিই পরবর্তীতে হয়েছিলেন ভারতের অনেক নামি টিভি সিরিয়ালের নায়িকা। তিনি এখন শুধু ভারতে নয়, তিনি এখন সারাবিশ্বের একজন নামকরা নৃত্যশিল্পী। এখন তিনি ইউরোপ, আমেরিকা, মধ্যপ্রাচ্য সহ বিশ্বের বিভিন্ন অঞ্চল থেকে নৃত্যের শোয়ের জন্যে আমন্ত্রণ পান এবং সেখানে গিয়ে দর্শকদের তার সেরা নাচ উপহার দেন।

তার জীবদ্দশাতেই তাঁর জীবনকে কেন্দ্র করে রচিত হয়েছে দুটি চলচিত্র- ময়ূরী এবং নাচে ময়ূরী। দুটি ভাষায় প্রকাশিত সেই চলচিত্র মানুষের প্রশংসা কুড়িয়েছে।  

দেশ ও বিদেশ থেকে নানা অনুষ্ঠানে তিনি নিমন্ত্রিত হয়েছেন নৃত্যের জন্যে। পেয়েছেন একাধিক জাতীয় ও আন্তর্জাতিক পুরস্কার। এ তাঁর যুদ্ধ জয়ের আত্মপ্রকাশ মাত্র। তিনি আজ আর নৃত্যানুষ্ঠান করেন না বটে তবে একটি নৃত্যের প্রশিক্ষা কেন্দ্র চালান। আজও তিনি একটি জীবন্ত লিজেন্ড। 

তিনি একজন নারী হয়েও সংগ্রাম করে যাচ্ছেন। আর আমরাতো সুস্থ সবল মানুষ। আমরাও চেষ্টা করলে সব পারব।

এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

নৃত্যশিল্পী, পা-হারানো, জীবন-যুদ্ধ, সফলতা