সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

সংস্কৃতি

মুক্ত ভাবনা

একুশ কি তবে আটকে গেছে কেবল একুশে


আমরা বাঙালি জাতি কি সত্যিই মনে রেখেছি একুশকে? বসন্তের নবম দিনটাই কেন আজ বরাদ্ধ ভাষা শহীদের স্মরণ করতে? একদিনের জন্য তাদের প্রতি ভালোবাসা দেখিয়ে যদি বাকি দিন তাদের অসম্মানই করি তবে কি লাভ এই ভালোবাসার?


student of Computer Science and Engineering(CSE) ২০ ফেব্রুয়ারী ২০১৬, ২৩:৩৫


প্রিয় শহীদ মিনারটা মুখরিত মানুষের ঢলে। ভাবতেই অবাক লাগে কদিন আগেও এখানে যাচ্ছেতাই ভাবে বসে থাকতো মানুষ জুতো পায়ে। অথচ আজ কি অপুর্বভাবে খালি পায়ে হাটছে সবাই। সবার পরনে সাদা আর কালোর ছোঁয়ায় একটা শোকের আবহ তৈরি হয়েছে। সবার হাতে আবার দেখছি রঙিন ফুল!

ওহ আচ্ছা, আজ তো একুশে ফেব্রুয়ারি। আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। তাই এত আয়োজন। না, একুশকে আমি ভুলিনি। তবে একুশকে কেবল একুশে আটকে রাখতে শিখিনি এখনও।

শহীদ মিনারের সামনে বছরের যে কোন দিন আসলেই এমনিই শ্রদ্ধায় আমার মাথা নত হয়ে যায়। পায়ের জুতো জোড়া আপনা আপনি খুলে যায় বেদিতে পা দেয়ার আগে।

আমরা বাঙালি জাতি কি সত্যিই মনে রেখেছি একুশকে? বসন্তের নবম দিনটাই কেন আজ বরাদ্ধ ভাষা শহীদের স্মরণ করতে? একদিনের জন্য তাদের প্রতি ভালোবাসা দেখিয়ে যদি বাকি দিন তাদের অসম্মানই করি তবে কি লাভ এই ভালোবাসার?

কথা বলছিলাম সপ্তম শ্রেণীর ছাত্র সজীবের সাথে। জানতে চাইলাম, একুশে ফেব্রুয়ারি সম্পর্কে। জানালো সেদিন আন্তর্জাতিক মাতৃভাষা দিবস। কি হয়েছিলো সেদিন? সেই সালটাই বা ছিল কবে? এমন প্রশ্নে বেশ খানিকটা সময় ভেবে উত্তর দিলো, ‘বায়ান্ন তে ভাষার জন্য আন্দোলন হয়েছিলো’।

তাও বেশ। সালটা তো জানে। ওর সহপাঠী রাকিব তো সালটাও ৭১ এর সাথে গুলিয়ে ফেলল। ওদের দোষ দিয়েই বা লাভ কি! আমরা ওদের শেখাতে পারিনি মাতৃভাষার জন্মলগ্নের ইতিহাস। বলিউডের নায়ক নায়িকার জন্ম থেকে শুরু করে জীবনযাত্রা সবটুকুই কিন্তু জানা এখনকার ছেলেমেয়েদের।

লোক দেখানো ভালোবাসা বা শ্রদ্ধা কোনটাই কাম্য নয় রফিক, শফিক, বরকতদের। একুশে ফেব্রুয়ারি প্রভাত ফেরিতে গিয়ে শ্রদ্ধা জানিয়ে, সন্ধ্যায় যদি হিন্দি সিরিয়ালে মুগ্ধ হন, তবে কি লাভ এই শ্রদ্ধাবোধের?

যদি সকালে ‘আমার ভাইয়ের রক্তে রাঙানো একুশে ফেব্রুয়ারি’ গেয়ে দুপুরে কানে হেডফোন দিয়ে হিন্দি বা অন্য গানে বুঁদ হয়ে যান, তবে কি মুল্য রইলো ভাইয়ের রক্তের? নাহ, অন্য ভাষায় গান শোনাটা দোষের নয়, তবে নিজের ভাষাকে ছোট করবেন না দয়া করে।

আজকাল বেতারে কান পাতলেই অবাক হয়ে যাই। বাংলা আর ইংরেজির অদ্ভুত এক সঙ্গমে গঠিত ভাষা ব্যবহার করেন কথাবন্ধুরা। কিন্তু কেন? হয় বাংলা বলুন, না হয় ইংরেজি।

সামাজিক যোগযোগ মাধ্যমে কোন তরুনীকে যখন ইংরেজি বর্নমালায় হিন্দি কথা লিখতে দেখি ভারী কষ্ট হয়। এই মায়ের ভাষা যে লড়াই করে জয় করা তা কি ওরা জানেনা? তাজা রক্তের বিনিময়ে যে অর্জন হয়েছিলো এই ভাষা তা কি তাদের কেউ কখনো বলেনি?

একুশ এখন নিয়ম পালনে বন্দী হয়ে গেছে। ফ্যাশন হাউজগুলোতে সাদা আর কালো পোশাকের আধিক্য, প্রতীকী শহীদ মিনারগুলোতে নতুন রঙের ছোঁয়া, রাস্তার মোড়ে কালো ব্যানার, স্কুল কলেজে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান আর ফুলের দোকানে ভীড়। ব্যাস, এতটুকুই হল অমর একুশের বাহ্যিক রুপ।

ভাষা শহীদরা কি এর জন্যই দিয়েছিলো নিজের প্রাণ? তাদের মত তো আর চিৎকার করে ‘রাষ্ট্রভাষা বাংলা চাই’ কিংবা ‘বাংলা আমার মায়ের ভাষা’ বলতে পারবো না। অন্তত ভাষাটাকে দূষিত না করি। একুশকে বছরের প্রতিটি দিনে ভাগ করে দেই। প্রতিটা দিন অহংকার করে বলি, ‘এই বাংলা আমার ভাষা। আমার প্রাণের ভাষা। আমার মায়ের ভাষা’। 


এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

একুশে-ফেব্রুয়ারি, শহীদ-মিনার, সাদা-কালো, সম্মান, ভালোবাসা, স্মরণ