সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

motorcycle-dhaka-dailystar.jpg

মটরসাইকেল, গতিতে সর্বনাশের হাতছানি

মনে রাখতে হবে, গতি আনন্দ দেয় তবে তা সাময়িক। তবে গতির জন্য যে দুর্গতি বয়ে আসে তা হয়ে যায় নিজের ও পরিবারের জন্য নির্মম ও অসহনীয়। নিয়ন্ত্রিত গতি, স্বাভাবিক জীবনযাপন এবং ট্রাফিকের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা গড়ে তুলতে পারে সুস্থ ও সুন্দর জীবন।

মটরসাইকেল একটি বহুল ব্যবহৃত এবং জনপ্রিয় যানবাহন। এ বাহনটি যুবক শ্রেণীর মানুষের কাছে অত্যন্ত সমাদৃত। তারুণ্যর উচ্ছলতার সাথে সাদৃশ্য আছে বলেই হয়তো এই বাহনটি যুবক যুবতীর কাছে আকর্ষণীয়।

বয়স্ক মানুষজন যে মটরসাইকেল ব্যবহার করে না তা নয়। তবে চালনায় নিয়ন্ত্রনহীনতার প্রকোপটা যুবক সমাজেরই একটু বেশি। আসলে যৌবনের উদ্যম শক্তিই হয়তো গতিতে ঝড় তোলার উৎসাহ যোগায়। কিন্তু এই গতিই যে নিমিষে তারুণ্যের বিস্তৃতিকে সংকুচিত করে কাউকে পাঠিয়ে দেয় না ফেরার দেশে। কাউকে আবার পংগুত্বের মাধ্যমে যৌবনকালেই বৃদ্ধের মত অন্যের বোঝা হয়ে চলতে হয় সারাজীবন।  

অন্যান্য যানবাহনের চেয়ে মটরসাইকেল দূর্ঘটনার ফলাফলটা একটু ভিন্ন। কেননা, মটরসাইকেল দুর্ঘটনায় পতিত হলে সবার আগে যাত্রী ক্ষতিগ্রস্ত হবে তারপর মটরসাইকেলের কিছু ক্ষয়ক্ষতি হতেও পারে নাও পারে। কারণ এই মটরযানে যাত্রীর দেহ থাকে বাইরে। 

আর এ কারনেই এই যানবাহনটি চালনার জন্য পৃথিবীর বিভিন্ন দেশে বিভিন্ন রকমের নিয়ম বলবৎ আছে। উন্নত বিশ্বে একের অধিক যাত্রী মটরসাইকেলে বহন নিষিদ্ধ থাকলেও গরীব দেশগুলোতে ছয়জনেরও অধিক যাত্রী নিয়ে প্রতিযোগিতায় অবতীর্ণ হতে দেখা যায়। অবিশ্বাস্য হলেও সত্যি যে অনেক সময় শুধু হ্যান্ডেল ধরা ছাড়া আর কোন নিয়ন্ত্রণ থাকেনা চালকের হাতে। বাকিটা নিয়ন্ত্রণ করে আরোহী ৩য় বা ৪র্থ যাত্রী। এসব কারণে অহরহ ঘটছে দুর্ঘটনা যার শিকার নারী, শিশু নির্বিশেষে।

মটরসাইকেল দূর্ঘটনায় ক্ষয়ক্ষতির পরিমাণ সহনীয় পর্যায়ে আনতে হেলমেট পরাটা সকল দেশের আইনেই বাধ্যতামূলক। কিন্তু এই আইনটি প্রয়োগের ক্ষেত্রটা দেশভেদে ভিন্ন রকমের। যেমন, যুক্তরাজ্য বা যুক্তরাষ্ট্রে হেলমেটবিহীন মটরসাইকেল চালানোর কথা কেউ চিন্তাও করে না। তাদের দৃষ্টিতে মটরসাইকেলের সাথে হেলমেট একটি অবিচ্ছেদ্য অংশ যা অবশ্যই পড়তে হবে। পক্ষান্তরে আমাদের দেশের মতো তৃতীয় বিশ্বের লোকজন হেলমেট পরাটাকে একটা বাড়তি ঝামেলা মনে করেন।

আর উপরের সবগুলো ঘটনার অন্তরালে রয়েছে আইন প্রয়োগের কঠোরতা এবং শিথিলতা। পাশাপাশি চালকের অশিক্ষা এবং উদাসীনতাও ব্যাপকভাবে দায়ী।

বিষয়টি নিয়ে লেখার অন্যতম কারণ হলো আমি নিজেও একজন মটরসাইকেল আরোহী। একটা সময় আমি নিজেও এই যানটি সহ্য করতে পারতাম না। কারণ আমি খুব কাছ থেকে মটরসাইকেল আরোহীদের মৃত্যু দেখেছি। দূর্ঘটনার ভয়াবহতা এতোটাই নির্মম ছিলো যে, লাশ বস্তাবন্দী করা ছাড়া উপায় ছিলো না।

যাইহোক, পরবর্তীতে কর্তব্যের খাতিরে এবং অর্থনৈতিক কারণে একটি মটরসাইকেল কিনতে বাধ্য হয়েছিলাম। চালিয়েছি ঢাকা শহরের নানা অলিগলিতে। লক্ষ্য করেছি অন্যান্য মটরসাইকেল চালকদের বৈশিষ্ট্য এবং তাদের উগ্রতা ও অশালীনতা। উপভোগ করেছি মটরসাইকেল চালকদের বিষয়ে অন্যান্য যানবাহন চালকদের বিরুপ ও মজাদার ধারণা।

সবকিছু মিলিয়ে কিছু উল্লেখযোগ্য বৈশিষ্ট্য উল্লেখ করলাম। অনেকেই একমত হতে পারেন আবার দ্বিমত পোষণ করার যথেষ্ট সুযোগ রয়েছে। বৈশিষ্ট্যগুলো হল:  
  • রাস্তায় নিজেকে অগ্রগণ্যতা পাওয়ার মত যাত্রী মনে করা। 
  • অধিক গতিতে চালনাকে ক্রেডিট বা বীরত্বের কাজ হিসেবে দেখা।
  • হেলমেট ব্যবহার কে অপ্রয়োজনীয় মনে করে হ্যান্ডেলের মধ্যে রেখে বীরের বেশে চালনা করা।
  • মটরসাইকেলের জন্য রাস্তার পাশে অন্যান্য যানবাহন কতৃক একহাত জায়গা খালি রাখাকে নিয়ম মনে করা। ভুলবশত কেউ না রাখলে তার সাথে খারাপ ব্যবহার করা।
  • ফুটপাথকে মটরসাইকেলের জন্য বৈধ রাস্তা মনে করা এবং পথচারী হাটতে থাকলে তাদের প্রতি বিরক্তি প্রকাশ করা। 
  • বিনা কারণে হর্ণ বাজিয়ে শব্দ দূষণ করে নিজের অবস্থান জানান দেয়া।
  • দ্বিতীয় আরোহী মহিলা হলে নিজেকে নায়ক নায়ক মনে করা এবং স্বপ্নের সিঁড়ি বেয়ে উপরে উঠার চেষ্টা করা। মহিলা যাত্রির জন্য হেলমেট চিন্তা করাও অকল্পনীয়। 
  • অন্য যেকোন যানবাহনের সাথে গতির পাল্লায় প্রতিযোগিতা করা।
  • সর্বোপরি ট্রাফিক আইন নিশ্চিন্তে অমান্য করা।
উপরোল্লিখিত বৈশিষ্ট্যগুলো সবার মধ্যে বিদ্যমান না হলেও বেশীরভাগ চালকের মধ্যেই বিরাজমান এ কথা বলা যায়। কিন্তু এই বৈশিষ্ট্যগুলো কোনভাবেই মঙ্গলজনক কিছু বয়ে আনতে পারেনা বলে প্রতীয়মান হয়। বরং ঠেলে দিতে পারে ভয়াবহ দূর্ঘটনার দিকে। পরিনতি পঙ্গুত্ব অথবা মৃত্যু যা কারোরই কাম্য নয়।

এইরকম একটি চরম বাস্তবতার মুখোমুখি দাঁড়িয়েও কেন আমরা সাবধান হতে পারছিনা? আশা করি নিম্নে বর্ণিত অল্পকিছু মতামতকে গুরুত্ব দিলে হয়তো বেঁচে যাবে কিছু তাজা প্রাণ, পংগুত্ব থেকে রেহাই পাবে টগবগে কিছু তরূন প্রাণ।

তাই এর ভয়াবহতা এড়াতে নিম্নের কার্যক্রম গুলো বিবেচনা করা যেতে পারে:
  • প্রত্যেক আরোহী হেলমেট পরিধান করা। 
  • গতিবেগ ৪০-৫০ কি.মি. ঘন্টায় সীমাবদ্ধ রাখা।
  • নিজে ফুটপাথে মটরসাইকেল না চালানো এবং অন্যদেরও নিরুতসাহিত করা। প্রয়োজনে আইন প্রয়োগকারী সংস্থার নিকট সোপর্দ করা।
  • বালি ও পাথরের মাঝে সাবধানে চালানো এবং এলোপাথাড়ি চালানো থেকে বিরত থাকা। 
  • প্রতিযোগিতার মনোভাব পরিহার করা। 
  • মটরসাইকেল চালানোর সময় মোবাইলে কথা বলা থেকে বিরত থাকা।
  • মহিলা দ্বিতীয় আসনধারী হলে অতি উৎসাহী হয়ে অন্যমনস্ক না হওয়া।
পরিশেষে এটা বলা অধিকতর শ্রেয় মনে করছি যে, নিজস্ব বিবেকে বাধা দেয় এমন সব কাজ থেকে বিরত থাকলেই মটরসাইকেল দুর্ঘটনা থেকে অনেকটাই দূরে থাকা যাবে।

মনে রাখতে হবে, গতি আনন্দ দেয় তবে তা সাময়িক। তবে গতির জন্য যে দুর্গতি বয়ে আসে তা হয়ে যায় নিজের ও পরিবারের জন্য নির্মম ও অসহনীয়। নিয়ন্ত্রিত গতি, স্বাভাবিক জীবনযাপন এবং ট্রাফিকের আইনের প্রতি শ্রদ্ধাশীলতা গড়ে তুলতে পারে সুস্থ ও সুন্দর জীবন। 

এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

মোটরসাইকেল, নিরাপত্তা, যানবাহন, নিরাপদ, সাবধানতা, গতি, যুবক, তরুণ, জোস, জীবন, শহর