সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

the-killer-sylhet.jpg

কেন এই পৈশাচিকতা বাংলাদেশে চলছে শিশু হত্যার মহোৎসব

এখনই যদি এর সুষ্ঠু সমাধানের আশু ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হয় তবে দিনে দিনে অবস্থা যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে তখন আর আমাদের সবার সম্মিলিত মেধা, জ্ঞান ও কোন কাজেই আসবে না।

বাংলাদেশে বর্তমানে দূর্বার গতিতে এগিয়ে চলছে শিশু হত্যার মহোৎসব। এ যেন অপ্রতিরোধ্য এক সংক্রামক ব্যাধি, যার বিরুদ্ধে প্রতিরোধ গড়ে তুলবার ন্যুনতম গরজও কেউ অনুভব করছেন না।

এই যে খুনোখুনির বিভৎস চেহারা, সেটা কী এখনও মধ্যযুগীয় বর্বরতাকে ডিঙ্গাতে পারে নি! আর কত পৈশাচিক হলে, আর কত সংখ্যক খুন হলে মধ্যযুগীয় সেই পৈশাচিকতার স্তর ডিঙ্গাতে বা সেই রেকর্ড ভাঙতে পারবে? গতকালের পত্রিকায় একজন মাননীয় সংসদ সদস্য আফ্রিকানদের অসভ্য বলেছেন বলে খবর বেড়িয়েছে, প্রশ্ন দাঁড়ায়, আমরা সভ্যতার কোন পর্যায়ে আছি? দয়া করে কেউ বলবেন কী?

বর্তমানে বাংলাদেশে কোন যুদ্ধাবস্থা বিরাজমান নয় তথাপিও মানবাধিকার সংগঠন আইন ও সালিশ কেন্দ্রের (আসক) পরিসংখ্যান অনুযায়ী ২০১২ সালে এ ধরনের হত্যকাণ্ড ঘটেছে ১২৬, ২০১৩ সালে ১২৮, ২০১৪ সালে ১২৭ আর এ বছরের মার্চ পর্যন্ত ৫৬ শিশু হত্যার শিকার হয়। এদের মধ্যে জুলাই থেকে ৪ আগস্ট পর্যন্ত ১৩ জনকে নৃশংস কায়দায় হত্যা করা হয়েছে। জানুয়ারি থেকে জুলাই পর্যন্ত সারাদেশে ৬৯ জন শিশু হত্যার শিকার হয়েছে। 

সাম্প্রতিক কালের ঘটনায় মাত্র মাস খানেকের ব্যবধানে সিলেটের ১৩ বছরের শিশু সামিউল আলম রাজনকে নির্মমভাবে পিটিয়ে হত্যার ঘটনায় দেশের মানুষ স্তম্ভিত। রাজনের মায়ের কান্না থামতে না থামতেই মাত্র কয়েকদিনের মধ্যেই পর পর আরও বেশ কিছু শিশু নৃশংস ভাবে হত্যার শিকার হয়, যার মধ্যে খুলনার রাকিব, ঢাকা মেডিক্যাল কলেজের সামনে সুটকেসের মধ্যে পাওয়া প্রায় ৮/৯ বছরের নাম না জানা শিশু গৃহ কর্মী’র(আনুমানিক) ক্ষত-বিক্ষত লাশ, এরপর জানা গেল বরগুনার রবিউল ইসলাম আওয়ালের মৃত্যু সংবাদ এবং আরও করুণ ঘটনা ঘটেছে চাঁদপুরের শাহরাস্তিতে বাবা-মায়ের পিটুনীতে ৩ বছরের শিশুকণ্যা, সুমাইয়া আক্তারের মৃত্যুর ঘটনা। অথচ কারণ গুলো ছিল একেবারেই তুচ্ছ!

সিলেটের রাজনের হত্যাকান্ডের জীবন্ত দৃশ্য দুনিয়াবাসী ইউটিউবে দেখেছে, খুলনার রাকিব অযথা নির্যাতনের কারণে 'শরিফ মটরর্স' থেকে কাজ ছেড়ে দিয়ে অন্যত্র কাজে যোগ দেয়ার অপরাধে শরিফ মটর্সের মালিক শরিফ ও তার সহযোগী মিন্টু মিয়া রাকিবের পায়ুপথে জোর পূর্ব্বক মটর সাইকেলের চাকায় হাওয়া দেওয়া পাইপের নল ঢুকিয়ে অতিরিক্ত হাওয়া দিয়ে তাকে হত্যা করা হয়। এতে তার পেটের ভিতরের নাড়ি-ভূড়ি ছিন্ন-বিচ্ছিন্ন হয়ে যায়। 

ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের সামনে থেকে সুটকেসের মধ্যে পাওয়া ৮/৯ বছরের শিশুর সারা গায়ে আয়রনের ছ্যাঁকা দিয়ে পুড়িয়ে মারা লাশ!

বরগুনার রবিউল ইসলাম আউয়াল (১০) মাদ্রাসার চতুর্থ শ্রেণীর ছাত্র। কথিত মিরাজ হোসেন মাছ চুরির অপবাদ দিয়ে শাঁবল দিয়ে পিটিয়ে ও খুঁচিয়ে তাকে হত্যা করে জলার মধ্যে ভাসিয়ে দেয়। শুধু তাই নয়, তার একটি চোখও তুলে নেয় !

আর চাঁদপুরের ঘঠনাটা ভৌতিকই বলতে হবে। শিশু সুমাইয়ার মা যে অলৌকিক ক্ষমতা প্রাপ্ত সে কথা মানুষকে বিশ্বাস করানোর জন্যেই নিজের শিশু কন্যা কে বাবা-মা দুইজনে মিলে ছয়দিন ধরে পিটিয়ে হত্যা করে!

এ ছাড়াও আছে আরও অনেক শিশু হত্যার নির্মম কাহিনী! যার দ্বারা একটা অসুস্থ সমাজের লক্ষণই প্রকাশ পায়।

এ ব্যপারে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের অপরাধ বিজ্ঞানের অধ্যাপক হাফিজুর রহমান কার্জন এক সাক্ষাৎকারে  বলেন, সমাজে বিচারহীনতা এবং অসুস্থ মানসিকতার প্রকাশ এই নির্মম শিশু নির্যাতন। বিচারহীনতার সংস্কৃতি শেকড় গেঁড়ে বসায় একটি শিশুকে নির্মম নির্যাতন করে হত্যার মতো জঘন্য অপরাধ করতে তারা সাহস পেয়েছে। তিনি বলেন, যারা এই কাজ করেছে তারা ভয়ংকর বিকৃত মানসিকতার। তবে তাদের এই কাজের মধ্য দিয়ে আমাদের অসুস্থ সমাজের চেহারা বেরিয়ে এসেছে৷ শিশুদের প্রতি সমাজ যে দরদি নয় তারই প্রকাশ ঘটেছে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের এই শিক্ষক বলেন, আমাদের দেশের আইনে ৯ বছর পর্যন্ত শিশুরা কোনো অপরাধ করে বলে গণ্য করা হয় না। আর ১৮ বছর পর্যন্ত শিশুরা অপরাধ করে, ভুল করে। কিন্তু আইনের এই কথা হৃদয়ে নেই৷ ফলে এই নির্মমতা ঘটেছে।

মানবাধিকার নেত্রী অ্যাডভোকেট এলিনা খান বলেন, এই বর্বরতা সীমাহীন৷ শিশুর প্রতি সহিংসতার জন্য আমাদের রাষ্ট্র ব্যবস্থাই দায়ী। তিনি বলেন, শিশুটিকে বুধবার প্রকাশ্যে পিটিয়ে হত্যা করা হয় অনেক লোকের সামনে৷আর তা ভিডিওতে ধারণ করা হয়েছে৷ কিন্তু সেই ভিডিও সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ার পর প্রতিবাদের ঝড় উঠলে চারদিন পর রোববার পুলিশ তৎপর হয়। আমার প্রশ্ন, প্রকাশ্যে ঘটা এই নির্মমতার খবর কী তখন পুলিশের কাছে পৌঁছায়নি? নিশ্চয়ই পৌঁছেছে৷ তাহলে পুলিশ কোনো ব্যবস্থা নেয়নি কেন?

এলিনা খান আরও বলেন, আমাদের সমাজ এবং রাষ্ট্রব্যবস্থার ভেতরেই নারী ও শিশুর প্রতি সহিংসতার বীজ লুকানো রয়েছে। তিনি বলেন, নির্যাতনকারীরাই নির্যাতনের ভিডিও করেছে৷ এটা প্রমাণ করে এই দেশে অপরাধীরা কতটা বেপরোয়া।

এই হ’লো আমাদের সমাজের বর্তমান বাস্তবতা। আজকে সময় এসেছে, আমাদের সমাজপতিদের ভাবতে হবে, কেন মানুষের মাঝে এই অস্থিরতা, কেন এই মানষিক বিকৃতি? এখনই যদি এর সুষ্ঠু সমাধানের আশু ব্যবস্থা গ্রহণ করা না হয় তবে দিনে দিনে অবস্থা যখন নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাবে তখন আর আমাদের সবার সম্মিলিত মেধা, জ্ঞান ও কোন কাজেই আসবে না।


এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

শিশুহত্যা, সিলেট, খুলনা, ঢাকা, অমানবিক, বিচার, শাস্তি, পুলিশ, আইন, আদালত, বাংলাদেশ