সংস্করণ: ২.০১

স্বত্ত্ব ২০১৪ - ২০১৭ কালার টকিঙ লিমিটেড

Lee-kuan-Yew.jpg

একজন লি বনাম আজকের বাংলাদেশ

‘গণতান্ত্রিক প্রজ্ঞাসম্পন্ন কোন ব্যক্তির ব্যবস্থাপত্রে নয়, আমি চাই সামাজিক শান্তি ও স্থিতিশীলতায় সমৃদ্ধ একটি দেশ’ - সিএনএনকে দেয়া এক সাক্ষাতকারে বলেছিলেন  লি কুয়ান ইউ। আধুনিক সিঙ্গাপুরের জনক।

আজ যে ভিতের ওপর দাঁড়িয়ে আছে সিঙ্গাপুর তার পুরো কৃতিত্ব লি’র।  অথচ এই দ্বীপদেশটি মাত্র সেদিন ছিল মশা উপদ্রুত ছোট একটি উপনিবেশিক ব্যবসা কেন্দ্র।

সুনসান পরিচ্ছন্ন একটি আধুনিক ও সারা বিশ্বের নজরকাড়া ব্যবসা কেন্দ্র বা দেশ আজকের সিঙ্গাপুর । ১৯৫৯এ লি যখন প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব নেন তখন সিঙ্গাপুর ছিল অখ্যাত এক খুদ্র জনপদ যার ছিল না কোন প্রাকৃতিক সম্পদ। ছিল না স্বাধীনতা। ব্রিটিশ এই উপনিবেশিক ব্যবসা কেন্দ্রে বসবাস ছিল চীনা, মালয় ও ভারতীয়দের। এখানে ছিলনা শান্তি। সব সময় লেগে থাকতো দাঙ্গা-হাঙ্গামা।

১৯২৩ সালে জন্ম নেয়া চীনা বংশোদ্ভুত ও অভিজাত শিক্ষা প্রতিষ্ঠান র‌্যাফেল ইনস্টিটিউশন ও ক্যাম্ব্রিজের ফিজ উইলিয়াম কলেজের মেধাবী ছাত্র লি কুয়ান ইউ দায়িত্ব নেয়ার পর সিঙ্গাপুরের চিত্র পাল্টাতে থাকে। আস্তে আস্তে তা অজকের সিঙ্গাপুরে রূপ নেয়। লি শুধু নিজের দেশকে না, দিয়েছেন সারা বিশ্বকে।

আমেরিকার প্রেসিডেন্ট বারাক হুসেইন ওবামা তাকে বলেছেন, ট্রু জায়ান্ট অফ দ্যা হিস্ট্রি বা ইতিহাসের সত্যিকারের বটবৃক্ষ। বলেছেন, ‘কুড়ি ও একুশ শতকের এশিয়ার কিংবদন্তী পুরুষ’।

আর লি’র ভাষায় - ‘তৃতীয় বিশ্বের অবস্থান থেকে প্রথম বিশ্বের অবস্থানে নেয়ার চেষ্টা করেছি।’

‘আমি শিখেছি মানুষ কিভাবে বেঁচে ছিল এবং কেমন অচরণ করা হয়েছে তাদের সাথে। কারণ তোমাকে খেতে হবে, বাঁচাতে হবে তোমার পরিবারকে। অমি শিখেছি ক্ষমতার অর্থ কি’। ২০০২এ সিএনএনকে দেয়া সাক্ষাতকারে বলেন লি।

ক্ষমতার অর্থ যে শুধুই নিজেকে প্রতিষ্ঠিত করা না তা যে কত ভালভাবে ঝুঝেছিলেন লি তা তাকে নিয়ে বিশ্ব নেতৃত্বের মন্তব্য থেকে বোঝা যায়।

চীনের প্রেসিডেন্ট জাই যিনপিং বলেছেন, লি কুয়ান ইউয়ের বিদায়ে বিশ্ব সম্প্রদায়ের ক্ষতিটা সিঙ্গাপুরের (ক্ষতির) মতোই মারাত্মক।

লি সম্পর্কে ঊনত্রিশ বছরের যুবক আইজাক সিউ’র মন্তব্য - 'যাত্রার শুরুতে তিনি এমন এক ব্যবস্থা প্রবর্তন করেন যাতে কোন সংঘাত ছিলনা'।

‘এশিয়ার অর্থনীতির যাদুর চাকা ঘুরিয়ে দিতে সাহায্য করেন তিনি’, মন্তব্য বারাক ওবামার।

এরকম লাখো মন্তব্যের পরশ নিয়ে ৯১ বছরের লি গত ২৩ মার্চ চলে যান এমন একস্থানে যেখান থেকে ফেরেনা কেউ, করা যায়না কারো সাথে যোগাযোগ।

তিন দশকের শাসনামলে আইনের ছাত্র লি’কে করতে হয় বেশকিছু কঠোর আইন যা গণতন্ত্রের সাথে যায়না। এ নিয়ে দেশের ভেতরে-বাইরে সমালোচনা হয়। কেউ কেউ তার নামের সাথে জুড়ে দেয় ‘ডিক্টেটর’ শব্দটি।

এই ডিক্টেটরশিপের (স্বৈরতন্ত্রের) সাথে আজকের বাংলাদেশের ‘গণতন্ত্রের’ বড় ফারাক। সে ফারাক গণতন্ত্রের সাথে স্বৈরতন্ত্রের না। বরং স্বৈরতান্ত্রিক আচরণের পেছনে লুকিয়ে থাকা গণতন্ত্রের সাথে বর্তমান বাংলাদেশের ‘গণতন্ত্রে’র।

পার্থক্যটা হল - পলেমব্যাঙের রাজপুত্র স্যাং নিলা উতামা ১৪ শতকে শিকারে এসে একটি দ্বীপের নাম দেন সিঙ্গাপুরা বা লায়ন সিটি (সিংহের শহর)। সংস্কৃতিতে সিংহা শব্দের অর্থ সিংহ আর পুরা অর্থ শহর।  

সুমাত্রার বেনকুলেনের লেফটেন্যান্ট গভর্নর স্যার টমাস স্টামফোর্ড র‌্যাফেরস ১৮১৯-এর ২৯ জানুয়ারি সাগর বিধৌত এই সিংহের শহরে আসেন। তিনি এই জনপদের ভেতর লুকিয়ে থাকা সম্ভাবনার কথা উপলব্ধি করেন। তাই সিঙ্গাপুরকে একটি গুরুত্বপূর্ণ ব্যবসায়িক কেন্দ্রে রূপান্তরে স্থানীয় শাসকদের সাথে চুক্তি করেন।

১৮৩২এ পেনাং, মালাক্কা ও সিংঙ্গাপুরের ভেতর সমঝোতার পর ১৮৬৯এ যাত্রা শুরু হয় সুয়েজ খালের। এবং তারপরই ১৮৭৩ ও ১৯১৩  এর মাঝের সময়ে পূর্ব-পশ্চিমের ভেতর সংযোগ স্থাপনকারী ব্যবসাকেন্দ্র হিসেবে অভাবনীয় উন্নতি হয় সিঙ্গাপুরের। ১৯১৯ সালে সিঙ্গাপুরের জনসংখ্যা এক লাফে ৮০,৭৯২-এ দাঁড়ায়। অথচ ১৮৬০ সালে এখানে মাত্র ১৫০ জন মানুষ বসবাস করতো। বিভিন্ন স্থান থেকে দলে দলে  মানুষ সিঙ্গাপুরে পাড়ি জমানোতে এই অবস্থা হয়। কিন্তু ১৯৪১ এর ৮ ডিসেম্বর দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে সিঙ্গাপুরের সাজানো সংসার ভেঙে খান খান হয়ে যায়।

দায়িত্ব নেয়ার পর লি কুয়ান ইউ সেই ধ্বসস্তুপকে তিলে তিলে গড়ে আজকের সিঙ্গাপুরে রূপান্তর ঘটান। এবং সেই তিনিই কারো কোন রকম আব্দার বা দাবি ছাড়াই ১৯৯০ স্বেচ্ছায় ছেড়ে দেন প্রধানমন্ত্রিত্বের লোভনীয় পদ।

আর আমাদের এই সোনার বাংলাদেশে যা ঘটছে তা যেন ঠিক এর বিপরীত। প্রথমে ২০২১ ও পরে ২০৪১ সাল পর্যন্ত ক্ষমতায় থাকার বাসনায় যা যা করা দরকার তার সবটুকু করতে রাখা হচ্ছেনা কোথাও কোন ত্রুটি। অর্থনীতি যাচ্ছে রসাতলে। তাতে কি! শত সফরসঙ্গী নিয়ে বিদেশ ভ্রমন চলছে। নিজের লোকের চাকরির সুযোগ সৃষ্টিতে ভাঙছে ঢাকা, গড়ছে নতুন নতুন বিভাগ। দেশ ডিজিটাল অথচ ভিন্নমত প্রকাশ করা যায়না ফেসবুক বা অন্যকোন সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম কিংবা ব্লগে। করা যায়না টকশো।

গণতান্ত্রিক দেশে আইনের চোখে সবাই সমান এই সত্যিটি ‘মারাত্মকভাবে পালিত’ হচ্ছে আমাদের দেশে। এখানে সরকারে বা তার সাথে নেই এমন যে কারো বিরুদ্ধে যা খুশি তা লেখা বা প্রকাশ করা যায় সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যম বা অন্য কোন গণমাধ্যমে। লেখা যায়, বলা যায় বিএনপি নেত্রী খালেদা জিয়ার বিরুদ্ধে। এমনকি জাতিসংঘ মহাসচিব বা বিদেশী কোন রাষ্ট্রদূত বা ভিন দেশের রাষ্ট্র অথবা সরকার প্রধান কিংবা অন্যকোন গুরুত্বপূর্ণ ব্যক্তিকে অশ্লীল ভাষায় অক্রমণ করলেও ক্ষতি নেই। কিন্তু সাবধান! এর বাইরের কারো গঠনমূলক সমালেচনাও করা যাবেনা। করলে তাকে হতে হবে খবরের বিষয়বস্তু। তাকে হয় আমার দেশের ভারপ্রাপ্ত সম্পাদক মাহমুদুর রহমান, একুশে টিভির চেয়ারম্যান বা মাহমুদুর রহমান মান্নার নয়তো ইলিয়াস আলী বা সালাহউদ্দিন আহমেদের  পরিণতি ভোগ করতে হবে। তা না হলে ‘রেল’ বা ‘সড়ক দুর্ঘটনা’, ‘বন্দুকযুদ্ধ’ ও ‘ক্রসফায়ার’তো আছেই। ইদানিং ‘গুম’ গণতন্ত্রের ‘জনপ্রিয়’ অনুসঙ্গ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

লি কুয়ান ইউ’র ‘স্বৈরতন্ত্র’ আর অমাদের ‘গণতন্ত্রে’র পার্থক্য এখানেই। তাইতো আমেরিকার রাজনৈতিক ম্যাগাজিন পলিটিকো মন্তব্য করেছে -  ‘সমস্ত স্বৈরশাসকই খারাপ না।’ কবে আমাদের দেশে জন্ম নেবে সেই ‘স্বৈরশাসক’?

সাইফুর রহমান সাইফ: সাংবাদিক
saifnewage@gmail.com


এখানে প্রকাশিত প্রতিটি লেখার স্বত্ত্ব ও দায় লেখক কর্তৃক সংরক্ষিত। আমাদের সম্পাদনা পরিষদ প্রতিনিয়ত চেষ্টা করে এখানে যেন নির্ভুল, মৌলিক এবং গ্রহণযোগ্য বিষয়াদি প্রকাশিত হয়। তারপরও সার্বিক চর্চার উন্নয়নে আপনাদের সহযোগীতা একান্ত কাম্য। যদি কোনো নকল লেখা দেখে থাকেন অথবা কোনো বিষয় আপনার কাছে অগ্রহণযোগ্য মনে হয়ে থাকে, অনুগ্রহ করে আমাদের কাছে বিস্তারিত লিখুন।

Development, Prime-Minister, Yew, Kuan, Lee, Bangladesh, Leadership, Singapore